ছবির ক্যাপশন:
বাংলাদেশের প্রান্তিক পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার প্রান্তিক পেশাজীবীদের জন্য ১০ দিনব্যাপী পেশাভিত্তিক সফট স্কিল প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় সদর উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের আয়োজনে সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ প্রান্তিক পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন (২য় ফেইজ)’ প্রকল্পের আওতায় এ প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তিথি মিত্র। উপজেলা সমাজসেবা অফিসার সাঈদ আল হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক জাকির হোসেন।
প্রশিক্ষণে সদর উপজেলার প্রান্তিক পর্যায়ের ৩০ জন পেশাজীবী অংশ নিচ্ছেন। ১০ দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, সময় ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও কর্মক্ষেত্রে আচরণসহ বিভিন্ন সফট স্কিল বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া প্রত্যেক পেশাজীবীকে প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে সম্মানী দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের ব্যাংক হিসাবে ১৮ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করা হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, ১০ দিনের এ প্রশিক্ষণে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তিক পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা অংশ নিচ্ছেন। তাদের নিজ নিজ পেশাগত দক্ষতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ, সময় ব্যবস্থাপনা, দলগত কাজ ও নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন প্রান্তিক পেশায় কাজ করে আপনারা আমাদের পুরোনো স্মৃতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে এখনো ধরে রেখেছেন। আমরা চাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব পেশা সারা জীবন টিকে থাকুক। আপনাদের মাধ্যমেই দেশের লোকসংস্কৃতির রেশ টিকে থাকবে।’
প্রান্তিক পেশাজীবীদের বিভিন্ন পেশার বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, চুয়াডাঙ্গায় এখনো অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা টিকে আছে, যেগুলোর বিষয়ে অনেকেই জানেন না। এর মধ্যে কাঁসা-পিতলের পণ্য প্রস্তুতকারকের মতো ঐতিহ্যবাহী পেশাও রয়েছে। এসব পেশা শুধু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত নয়, একই সঙ্গে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তিনি জানান, প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ৩০ জনের মধ্যে ১৪ জন বাঁশ ও বেতপণ্য প্রস্তুতকারক, পাঁচজন নাপিত, তিনজন নকশিকাঁথা শিল্পী, পাঁচজন কুমার, একজন কামার, একজন লোকজ শিল্পী এবং একজন কাঁসা-পিতলপণ্য প্রস্তুতকারক রয়েছেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষ ও অভিজ্ঞ। তাদের সেই দক্ষতাকে আরও শানিত করতেই এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, লোকজ শিল্পীদের প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। কারণ প্রান্তিক পেশাজীবীরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের পুরোনো স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘হাতের কাজের মূল্য অনেক। একই ধরনের একটি পণ্য বড় দোকানে হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হলেও ফুটপাতে সেটিই কয়েকশ টাকায় পাওয়া যায়। এর পেছনে পার্থক্য তৈরি করে কাজের দক্ষতা, কারুকাজ ও উপস্থাপন।’
তিনি বলেন, কারুশিল্পের নিখুঁত কারুকাজ সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আর পণ্যের গুণগত মান, সৌন্দর্য ও উপস্থাপনের ওপরই অনেকাংশে এর বাজারমূল্য নির্ধারিত হয়। বিশেষ করে বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যের দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। একইভাবে মৃৎশিল্প ও নকশিকাঁথা বাংলাদেশের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘আপনাদের কাজগুলো আরও দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন ও বাজারজাত করার জন্য সরকার পাশে রয়েছে। প্রান্তিক পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেই এ ধরনের প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে,’ বলেন জেলা প্রশাসক।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে প্রান্তিক পেশাজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে এসব পেশার অনেকগুলো হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকলেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনেক মানুষ ঐতিহ্যবাহী এসব পেশাকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আধুনিক বাজারব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সঠিক বিপণন কৌশলের সঙ্গে তাদের যুক্ত করা গেলে এসব পেশার আরও বিকাশ ঘটবে।
বক্তারা আরও বলেন, শুধু পেশাগত দক্ষতা থাকলেই বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ, সময়ের সঠিক ব্যবহার, দলগতভাবে কাজ করা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং পণ্যের মান ও উপস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা থাকাও জরুরি। এ কারণে প্রান্তিক পেশাজীবীদের জন্য সফট স্কিল প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আয়নাল হক, প্রশিক্ষক ও উপজেলা সমাজসেবা অফিসার এস এম দেলোয়ার হোসেন, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সময়ের সমীকরণের প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন, জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মানিক আকবর, সমাজসেবা কার্যালয়ের স্টাফ আব্দুল হাকিম কাজী, সেলিম হোসেন, আসাদুল ইসলাম, শাহনাজ পারভীনসহ সংশ্লিষ্টরা।
