ছবির ক্যাপশন:
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে স্থিতিশীলতার পথে হাঁটা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হেয় প্রতিপন্ন করতে এবং দেশের সার্বভৌমত্বকে চাপের মুখে ফেলতে এক গভীর চক্রান্তের আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মহলে ভিত্তিহীন ‘জঙ্গি ইস্যু’ উসকে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র বৈদেশিক কিছু গোষ্ঠী। তবে এ ধরনের সমস্ত প্রক্সি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় শতভাগ শক্ত ও পেশাদার অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্র।
ভিত্তিহীন অনুমান ও সরকারের শক্ত বার্তা সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি সন্ত্রাসবাদবিষয়ক আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে আফগানিস্তানে আল-কায়েদার উপমহাদেশীয় শাখা আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস)-এর সক্রিয়তা, নেতৃত্ব এবং সম্ভাব্য বহির্মুখী তৎপরতার ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। ওই আন্তর্জাতিক পর্যালোচনায় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশকে ব্যবহার করে সংগঠনটির সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক বা কোষ গড়ে তোলার একটি আনুমানিক আশঙ্কার কথা বলা হয়। তবে এই মূল্যায়নে বাংলাদেশে একিউআইএস'র কোনো সক্রিয় ঘাঁটি, সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা প্রত্যক্ষ সাংগঠনিক কাঠামোর ন্যূনতম কোনো প্রমাণ পেশ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক এই অনুমাননির্ভর তথ্যকে কেন্দ্র করে দেশে এবং দেশের বাইরে একটি বিশেষ মহল কৃত্রিম আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা চালালেও, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এটিকে গুরুত্বহীন বলে গণ্য করা হচ্ছে। সরকার এই সতর্কবার্তাকে দেশের অভ্যন্তরে কোনো বাস্তব নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে গ্রহণ করছে না। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জানান, গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশিত ওই আন্তর্জাতিক তথ্যের বিষয়ে সরকার ওয়াকিবহাল থাকলেও এটি সম্পূর্ণ পূর্ণ অনুমাননির্ভর। কেবল একটি আন্তর্জাতিক ধারণানির্ভর খবরের ওপর ভিত্তি করে অযাচিত আতঙ্ক ছড়ানো কিংবা কোনো অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সরকারের নেই। দেশের সার্বভৌমত্ব ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিজস্ব সক্ষমতায় পূর্ণ সুরক্ষিত রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
প্রক্সি রাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক চক্রান্ত:
সরকার জাতিসংঘের রিপোর্টকে কোনো আইনি বা নিরাপত্তা পদক্ষেপের ভিত্তি না বানালেও, এর নেপথ্যে চলমান বিশ^রাজনীতি ও প্রক্সি চক্রান্তের বিষয়টি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, কোনো হুমকি সরাসরি দৃশ্যমান হওয়ার আগেই তার পেছনের নেপথ্য কারণগুলো অনুসন্ধান করা নিরাপত্তার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে জানান, জাতিসংঘ কিংবা বৈশি^ক সংস্থাগুলোর এমন প্রচারণাকে হুট করে সত্য বা মিথ্যা বলে উড়িয়ে না দিয়ে বিষয়টিকে ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বিশ^জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধের ধরন ও কৌশল ব্যাপকভাবে বদলেছে। সরাসরি সশস্ত্র সংঘাত বা মুখোমুখি লড়াইয়ের বদলে এখন বিভিন্ন দেশ বা স্বার্থান্বেষী মহল ‘প্রক্সি ধিৎ’ বা পররোক্ষ সংঘাতের পথ বেছে নিচ্ছে। শক্তিশালী রাষ্ট্র কিংবা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীগুলো অনেক সময় নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য হাসিল করতে আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন বা কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এর মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট কোনো দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে বিশ^মঞ্চে চাপে ফেলতে, দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে ক্ষমতাচ্যুত শক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীরা এমন কোনো প্রক্সি গোষ্ঠীকে ইন্ধন জোগাচ্ছে কি না-তা খতিয়ে দেখাই এখন গোয়েন্দাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। ড. নাসির উদ্দিন আহমদ আরও স্পষ্ট করেন, কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ভিন্নমতকে ঢালাওভাবে উগ্রবাদ বলা যাবে না; বরং সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ এবং বিদেশি যোগাযোগের মাধ্যমেই মূল চক্রান্তকারীদের চিহ্নিত করতে হবে।
সমন্বিত নজরদারি ও অতীতের অভিজ্ঞতা:
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিগত কয়েক মাসের গতিপ্রকৃতি ও অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এনে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সময়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরিবর্তিত পরিবেশের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বিভিন্ন অপশক্তি। গত ৫ আগস্টের পর কারাগার ভেঙে কিংবা জামিনে এমন অনেক ব্যক্তি বের হয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে উগ্রবাদী তৎপরতার অভিযোগ ছিল। এছাড়া রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের মধ্যবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছুটা ব্যস্ততার সুযোগে কোনো রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা গোষ্ঠী যেন প্রথাগত বা অপ্রথাগত চরমপন্থাকে উসকে দিতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি
দরকার।
দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা প্রবীণ মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন এ বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশকে পুরোপুরি হুমকিমুক্ত ভেবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। তবে এটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক উগ্রবাদের প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার। উগ্র ভাবাদর্শকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অতীতের এক দশক ধরে অর্জিত বিশাল পেশাদার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের ভয়াবহ পর্যায় কিংবা হলি আর্টিজান পরবর্তী কঠিন সময়ে দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যেভাবে আন্তর্জাতিক মানের সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা গড়ে তুলেছিল, তা এখনও পুরোপুরি কার্যকর।
নূর খান লিটনের মতে, জঙ্গিবাদ ও প্রপাগান্ডা দমনে কেবল অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার বা তাৎক্ষণিক অভিযানই যথেষ্ট নয়; বরং এর পেছনে থাকা আর্থিক লেনদেন, উগ্রবাদী মতাদর্শের ডিজিটাল বিস্তার, তরুণদের র্যাডিক্যালাইজেশন এবং অনলাইন প্রপাগান্ডা সেলগুলোর উৎস চেনার জন্য একটি সর্বাত্মক ও সমন্বিত আইনি কৌশল প্রয়োগ করতে হবে।
অপ্রচলিত বিস্ফোরক ও বিদেশি অর্থায়ন:
জাতিসংঘের বার্তায় একিউআইএস-এর বিকেন্দ্রীভূত ও কম দৃশ্যমান নেটওয়ার্ক তৈরির যে প্রবণতার কথা বলা হয়েছে, তার মূল কেন্দ্রবিন্দু মূলত মূলত ভূ-আঞ্চলিক রাজনীতি। আধুনিক সন্ত্রাসী বা উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো আর আগের মতো প্রকাশ্য অবকাঠামো, নির্দিষ্ট ঘাঁটি কিংবা প্রকাশ্যে আসা একক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে কাজ করে না। বরং তারা খুব ক্ষুদ্র সেল, প্রক্সি এজেন্ট এবং অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে পরিচালিত হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহমদের মতে, প্রথাগত কাঠামোর বাইরে এ ধরনের বিকেন্দ্রীভূত চক্রান্ত চিহ্নিত করার মূল চাবিকাঠি হলো তাদের ‘অর্থের উৎস’ অনুসন্ধান করা।
যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি, সরঞ্জাম সংগ্রহ কিংবা সন্ত্রাসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে সম্প্রতি কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে প্রেশার কুকার, ছাতা কিংবা পাইপ ব্যবহার করে যেসব আনকনভেনশনাল এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে, তা থেকে এটি স্পষ্ট যে, সাধারণ অপরাধের বাইরে এর পেছনে রয়েছে একটি বড় আর্থিক নেটওয়ার্ক। এই ধরনের অপতৎপরতায় বিদেশি আর্থিক লেনদেন, হুন্ডি চ্যানেল কিংবা সুনির্দিষ্ট বৈদেশিক অর্থায়নের স্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়। গোয়েন্দা ও ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইঋওট) মাধ্যমে এই অর্থের প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডদের খুঁজে বের করা গেলে বাংলাদেশবিরোধী সব অপপ্রচারের মুখোশ উন্মোচিত হবে।
ষড়যন্ত্র রুখে জাতীয় স্থিতিশীলতার অঙ্গীকার:
ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে অবস্থিত। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে এই অঞ্চলটি বিশ^রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই ভৌগোলিক গুরুত্বের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অরাষ্ট্রীয় শক্তি বা আঞ্চলিক প্রতিবেশী তাদের কৌশলগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতেই পারে। তবে ভৌগোলিক অবস্থানকে কখনোই কোনো দেশে জঙ্গিবাদ থাকার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; এটি মূলত নিরাপত্তার বৈশি^ক ঝুঁকি মূল্যায়নের একটি অনুষঙ্গ মাত্র।
এই মুহূর্তে জাতিসংঘের বার্তা বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরকে পুঁজি করে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা যাবে না। আবার একই সঙ্গে আত্মতুষ্টিতে ভোগারও কোনো অবকাশ নেই। চক্রান্তকারীদের মূল লক্ষ্য দেশের উন্নয়ন স্তব্ধ করে দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা। তাই বাংলাদেশ কোনোভাবেই উগ্রবাদের নতুন কোনো নেটওয়ার্কের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে দেবে না। সাইবার স্পেসের গুজব নিরসন, আর্থিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি কৃত্রিম জালিয়াতিগুলোকে প্রতিহত করার মাধ্যমে বর্তমান সরকার এবং পেশাদার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশে পূর্ণ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ। রাষ্ট্র সম্পূর্ণ শক্ত অবস্থানে থেকে প্রমাণ করে দেবে-বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিদেশি ভূষ্ম থেকে চালানো সব ধরনের চক্রান্ত ও অপপ্রচার নস্যাৎ করতে দেশের সচেতন জনগণ ও নিরাপত্তা কাঠামো একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।
