ছবির ক্যাপশন:
রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে ঘেরা নৌপথগুলো পুনরায় সচল করা এবং নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারে এক সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, দূষণ প্রতিরোধ করা, ড্রেনেজব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নদী তীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল রোববার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিশেষ সভাকক্ষে রাজধানী ঢাকার চারপাশে নৌপথ চালু সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব দিকনির্দেশনা দেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নৌপথ সচল ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ:
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে ও যানজট নিরসনে ঢাকার চারপাশের ঐতিহ্যবাহী নৌপথ সচল করা অত্যন্ত জরুরি বলে সভায় মতপ্রকাশ করা হয়। উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, ঢাকার চারপাশের চার নদী- বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যাকে কেন্দ্র করে নৌপথ পুরোপুরি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগকে আরও গতিশীল এবং আধুনিক করতে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। আগ্রহী বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নৌপথে আধুনিক ‘ওয়াটার বাস’ পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে নগরবাসীদের সামনে চলাচলের জন্য একটি আরামদায়ক, নিরাপদ ও বিকল্প যোগাযোগমাধ্যম উন্মোচিত হবে।
নদী দূষণ প্রতিরোধ ও ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন:
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনিয়ন্ত্রিত দূষণ ও পলি জমে নাব্যতা হ্রাস পাওয়া। সভায় প্রধানমন্ত্রী নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। নৌপথ সচল করার পাশাপাশি কীভাবে ঢাকার নদীগুলোর দূষণ রোধ করা যায়, শিল্পবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্য নদীতে পড়া বন্ধ করা যায় এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন ঘটিয়ে নদীর নাব্য ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা যায়- সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রাণালয় ও সংস্থাগুলো দ্রুত দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও ক্যাপিটাল ড্রেজিংসহ নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন সরকারপ্রধান।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ:
স্থানীয় গাছপালা রোপণের মাধ্যমে নদীতীরের জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা। সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সভায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ এবং দুই সিটি কর্পোরেশনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন এবং নিজ নিজ দপ্তরের কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন।
‘বেসরকারি উদ্যোগে চালু হবে ওয়াটার বাস’
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করে চক্রাকার নৌপথে বেসরকারি উদ্যোগে ওয়াটার বাস চালুর পরিকল্পনার কথা জানালেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো নির্ধারিত কাজ দ্রুত শেষ করতে পারলে রাজধানীর চক্রাকার নৌপথে বেসরকারি উদ্যোগে ওয়াটার বাস চালু করা সম্ভব হবে। গতকাল সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, ‘ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করে ওয়াটার বাসসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচলের উপযোগী করতে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নদীর নাব্য রক্ষা, দুষণ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলোও এই পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে। এসব কাজ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘দুই থেকে তিন মাস পর আবারও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে বৈঠক করা হবে। ওই বৈঠকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে। সমন্বিতভাবে কাজ এগোলে বাজবানীর নদীপথকে আবারও কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।’ নদীপথে নিচু সেতুর বিষয়েও কথা বলেন শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, টঙ্গীর রেলসেতুসহ কয়েকটি সেতুর নিচ দিয়ে ওয়াটার বাস চলাচল সম্ভব নয়। সড়ক সেতুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে সেগুলো উঁচু করার পরিকল্পনা নেওয়া হবে। তবে রেলসেতু উঁচু করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই যেসব স্থানে এ ধরনের সমস্যা থাকবে, সেখানে যাত্রীদের এক পাশ থেকে নেমে অন্য পাশে গিয়ে আবার ওয়াটার বাসে ওঠার ব্যবস্থা রাখা হতে পারে।’
আগের ওয়াটার বাস প্রকল্পে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিসির ৫৭ কোটি টাকা লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে যাত্রী স্বল্পতা, নদীদূষণ এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক ওয়াটার বাস পরিচালনা করতে না পারাকেই লোকসানের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতীতের সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাগুলো দূর করেই নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপাতত এ প্রকল্পের জন্য আলাদা কোনো বাজেট নির্ধারণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করবে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে প্রকল্পের অগ্রগতি বিবেচনায় বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
ওয়াটার বাস চালুর সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, ‘এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ। বিভিন্ন দপ্তরের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, তত দ্রুত ঢাকার চক্রাকার নৌপথে বেসরকারি উদ্যোগে ওয়াটার বাস চালু করা সম্ভব হবে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, নদীপথের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে রাজধানীর যানজট কমানোর পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য একটি বিকল্প, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
চার নদীর বর্তমান চিত্র ও চক্রাকার নৌপথের সম্ভাবনা:
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ঢাকা বিশ^জুড়ে অত্যন্ত বিরল ও সমৃদ্ধ এক নদীবেষ্টিত শহর। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা- এই চার নদী দিয়ে ঢাকাকে একটি পূর্ণাঙ্গ চক্রাকার নৌপথে পরিণত করা সম্ভব। সদরঘাট থেকে শুরু করে গাবতলী, আশুলিয়া, টঙ্গী, পূর্বাচল, ডেমরা ও কাঁচপুর হয়ে পুনরায় সদরঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত এই রুট চালু হলে প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী তীব্র যানজট এড়িয়ে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতে পারবেন। এতে সড়কপথের ওপর থেকে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পরিবহনের চাপ কমে যাবে, যা জ্বালানি সাশ্রয় এবং সময় বাঁচানোর ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদান রাখবে।
বাস্তবায়ন ও তদারকি প্রক্রিয়া:
মহাপরিকল্পনাটি যাতে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, সে জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় যৌথ তদারকি কমিটি গঠন করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি প্রতি মাসে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে এবং সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেবে। আজকের সভার এই সুনির্দিষ্ট ও সর্বাত্মাক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ঢাকা তার য তার হারানো নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্য ফিরে পাবে এবং তিলোত্তমা ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে নতুন রূপ লাভ করবে বলে আশা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞ ও নগরবাসীর প্রত্যাশা নদীবেষ্টিত ঢাকা শহরের যোগাযোগ কাঠামোর অন্যতম বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এর নৌপথে। কিন্তু অতীতে একাধিকবার ওয়াটার বাস ও নৌপথ সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমন্বয়হীনতা, নাব্যতা সংকট ও দূষণের কারণে তা স্থায়ী রূপ পায়নি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই সমন্বিত নির্দেশনার ফলে রাজধানীবাসী আশা করছেন, এবার হয়তো ঢাকা তার হারানো ঐতিহ্য ও স্বস্তিদায়ক নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা ফিরে পাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে এনে ওয়াটার বাস সার্ভিস সফলভাবে চালু করা গেলে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোর ওপর অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পরিবহনের চাপ কমে আসবে। একই সঙ্গে নদীর তীরের সুন্দর ওয়াকওয়ে এবং বৃক্ষরোপণ পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। উপ-প্রেস সচিব জানান, সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত তদারকি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, যাতে বিভিন্ন সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় বজায় থাকে এবং দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়।
