ছবির ক্যাপশন:
এবার দল পুনর্গঠনে মনোযোগ দিয়েছে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল হওয়ায় এর মধ্যে দলের অনেকে সরকারে চলে গেছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়েছেন অনেকে। এ কারণে দলের কর্মকান্ডে কিছুটা ভাটা পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় কর্মকান্ড চাঙা করতে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য দলীয় কাউন্সিল আয়োজনসহ অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠন করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা জানান, তিন বছর মেয়াদি কমিটি গঠনে সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এ ছাড়া দলটির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টি কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। বিএনপির ৮২ কমিটির ৭২টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। বিশেষ করে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখেই দল গোছানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি।
অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন :
বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে এসব কমিটি দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। তাই সংগঠনকে শক্তিশালী করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের চিন্তা করছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের নির্দেশনা দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় দলীয় নেতারা সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন। তাঁদের মতে, দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে নির্বাচনে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সুযোগ নিতে পারে। তাই নির্বাচন সামনে রেখে মূল দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে নতুন নেতৃত্বে পুনর্গঠন করাই এখন বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতীদল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস ও ওলামা দল-এই ৯টি হলো বিএনপির অঙ্গসংগঠন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও শ্রমিক দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন। তবে এসব সংগঠনের অধিকাংশেরই পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র নেই। প্রায় ৪৭ বছরেও ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র তৈরি হয়নি।
বিএনপির কাউন্সিল :
বিএনপির গঠনতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা হয়নি। তবে এ সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন। দলীয় দায়িত্বশীল নেতারা জানান, চলতি বছরের শেষের দিকে দলের সপ্তম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ জন্য দায়িত্বশীলদের ৮২টি সাংগঠনিক জেলা ও অধিভুক্ত উপজেলার মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগে দলকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকগুলোতেও অধিকাংশ নেতা কাউন্সিল করার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন। একই সঙ্গে কাউন্সিলের দিনক্ষণ ঘোষণার জন্য দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দায়িত্ব দিয়েছে জাতীয় স্থায়ী কমিটি। দায়িত্বশীলরা আভাস দিয়েছেন, এবার কাউন্সিলে থাকবে নতুন নতুন চমক। পরিবর্তন হবে দলীয় গঠনতন্ত্রের কিছু ধারা-উপধারা। দীর্ঘ ৯ বছর পর দলের কাউন্সিলে ১৬ বছর রাজপথে থাকা নেতাদের আমলনামা অনুসারে ভাগ্য নির্ধারণ হবে। যোগ্য, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে নবরূপে সাজানো হবে বিএনপিকে।
বিএনপির ৮২ কমিটির ৭২টিই মেয়াদোত্তীর্ণ :
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও সাংগঠনিক তৎপরতায় পিছিয়ে পড়ছে বিএনপি। সারা দেশে ৮২ কমিটির মধ্যে এখন ৭২টি মেয়াদোত্তীর্ণ। শুধু সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি নয়; সারা দেশে বিএনপির থানা-উপজেলা এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিও এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। জানা গেছে, সারা দেশে বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর মধ্যে ৪৯টি আহ্বায়ক কমিটি এবং ৩১টিতে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি। এসব কমিটির মধ্যে মেয়াদ রয়েছে মাত্র ৮ জেলা ও মহানগর কমিটির। ৭২টি কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতিটি জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ দুই বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে কাউন্সিলে নতুন কমিটি গঠন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যর্থ হলে যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে আরও তিন মাস সময় নিতে পারবে। এই সময়েও কমিটি গঠনে ব্যর্থ হলে পূর্ববর্তী কমিটি বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে। এরপর কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের শর্তে তিন মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেবে কেন্দ্র। যদি আহ্বায়ক কমিটিও ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে কেন্দ্র কমিটি গঠন করে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনে গুরুত্ব :
স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সাফল্য পেতে চায় বিএনপি। সে জন্য দল শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত শনিবার বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আগামী স্থানীয় নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পায়। বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে থেকে শুরু হতে পারে এবং দল কীভাবে প্রস্তুতি নেবে, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
সূত্র জানায়, নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলেও বিএনপি সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে এবার সতর্ক অবস্থান নিতে চায়। এজন্য বিভিন্ন এলাকায় জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং হবে। তাই এখন থেকেই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা সংগঠনের চলমান প্রক্রিয়া। তবে জাতীয় কাউন্সিল হলে সংগঠনটি নতুন নেতৃত্ব পায়। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থাকা ত্যাগী, সংগ্রামী, পরীক্ষিত নেতারাই সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ পান। এতে ত্যাগীরা যেমন মূল্যায়িত হন, তেমনি সংগঠনও শক্তিশালী হয়।
কাউন্সিলের বিষয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের সীমাহীন নির্যাতনে বিএনপি তখন স্বাভাবিক দলীয় কর্মকান্ড চালাতে পারেনি। তাই উদ্যোগ নেওয়ার পরও দলের জাতীয় কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। এখন রাজনীতির পরিবেশ এসেছে। তাই দলের জাতীয় কাউন্সিলও হবে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির কাউন্সিল এই বছরের মধ্যেই। এখনো আমরা সময় নির্ধারণ করিনি। দলের কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলের লোক অনেকে সরকারে চলে গেছেন। সেই জায়গাগুলো পূরণ হতে সময় লাগবে। এটা বিচ্ছিন্ন ব্যাপার না। এটা আলাদা করে দেখা যাবে না। সরকার তার কাজ করবে, দল তার কাজ করবে।
