ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গায় অতি ভারী বর্ষণে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে জনজীবন। রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতে জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে অসংখ্য সড়ক ও শত শত হেক্টর ফসলি জমি। পানির তোড়ে কোথাও সড়ক ধসে পড়েছে, আবার কোথাও কৃষকের মাছের ঘের ভেসে গেছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানিয়েছেন, গত শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গায় রেকর্ড ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এরপর শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত আরও ৯.৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
স্থানীয় কৃষক ও আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, শুক্রবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই বৃষ্টিতে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আমন বীজতলা, শাকসবজি ও বিভিন্ন আবাদি ফসল এখন পানির নিচে।
ভারী বর্ষণে গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুর কাঁঠালতলা থেকে কুমারীদহ গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির একটি বড় অংশ ধসে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এদিকে, দামুড়হুদা-কার্পাসডাঙ্গা আঞ্চলিক সড়কের চিৎলা-গোবিন্দহুদা এলাকায় রাস্তার পাশে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে তৈরি হওয়া গর্তে ভূমিধস দেখা দিয়েছে। এতে প্রধান সড়কটি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিকেলে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন ও এলজিইডির প্রকৌশলীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
এদিকে চুয়াডাঙ্গায় টানা ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সদর উপজেলার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভেমরুল্লাহ এলাকার অন্তত ৩০টি পরিবারের প্রায় ১৩০ জন মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে স্থানীয় ভেমরুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। আকস্মিক এ দুর্যোগে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। জলাবদ্ধতার কারণে রান্নাবান্নাও বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না আর বয়োবৃদ্ধদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভেমরুল্লাহ জেলখানার পেছনে সরকারি খাস জমিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। বসতঘরে পানি জমে থাকায় সেখানে বসবাস করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে তারা প্রয়োজনীয় সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে স্থানীয় ভেমরুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
আশ্রয় নেওয়া বাসিন্দা জমেলা খাতুন বলেন, তাদের ঘরবাড়ি পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানে থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই বলেই তারা স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানান, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। সরকারের কাছে তাদের দাবি, যেন স্থায়ীভাবে নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়।
আরেক বাসিন্দা আমেনা খাতুন বলেন, পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি সাপ ও বিভিন্ন বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে গেছে। জীবন ঝুঁকির কারণে তারা স্কুলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, তারা সরকারি খাস জমিতে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষ। স্থায়ী কোনো বসবাসের জায়গা নেই। এখন পানিতে সব তলিয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে। দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নিরাপদভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
এদিকে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার বিত্তবান ও সাধারণ মানুষ। তারা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করছেন।
অপরদিকে জীবননগরের একতারপুর গ্রামের রাস্তা ভেঙে যাওয়ার সংবাদ দৈনিক সময়ের সমীকরণ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরে গতকাল শনিবার বেলা ২টার দিকে রাস্তা পরিদর্শন করতে আসেন জীবননগর উপজেলার নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি। তিনি রাস্তাটির দ্রুত সংস্কারের জন্য উথলী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহিরুল হক ঝন্টু নির্দেশ দেন। নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই রাস্তার সংস্কারের কাজ চলছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন একতারপুর গ্রামের ইউপি সদস্য আশরাফুল ইসলাম রতন।
