চুয়াডাঙ্গায় ‘মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব ও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার প্রতিরোধ’ শীর্ষক সেমিনার

ভারী যানবাহন চালকদের প্রায় ৬৯ শতাংশ মাদক সেবন করেন

আপলোড তারিখঃ 2026-07-09 ইং
চুয়াডাঙ্গায় ‘মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব ও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার প্রতিরোধ’ শীর্ষক সেমিনার ছবির ক্যাপশন:

চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের গাড়িচালক, চালক সহকারী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে ‘মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব ও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার প্রতিরোধ’ শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসকের তিন বছর মেয়াদী অগ্রাধিকার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সম্মেলনকক্ষে এ সেমিনারের আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। সেমিনারে স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শারমিন আক্তারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার।


মূল প্রবন্ধে জেলা প্রশাসক বলেন, একজন গাড়িচালক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পান না। ফলে অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আবার অনেকে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালিয়ে বেশি ভাড়া আয় করার উদ্দেশ্যে ক্লান্তি দূর করতে মাদক সেবন করেন। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ক্লান্তি দূর করার জন্য মাদক নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিশ্রাম। অনেক চালক গাড়ির ভেতর ধূমপান করেন, এমনকি ধূমপান ছাড়া গাড়ি চালাতেও পারেন না।


এসময় তিনি একটি মাদকাসক্তি ও সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ক পরিসংখ্যানের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ভারী যানবাহন চালকদের প্রায় ৬৯ শতাংশ মাদক সেবন করেন। এবং ঢাকায় কমপক্ষে ৫০ হাজার গণপরিবহন চালক ও তাদের সহকারীরা মাদকাসক্ত। গাড়ি চালকদের মাদক গ্রহণের ফলে ৩০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আর ৯৭ শতাংশ চালক কোনো না কোনোভাবে মাদক গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, এই মাদক তিলে তিলে মানুষকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। একসময় এটি শুধু একজন ব্যক্তিকেই নয়, তার পুরো পরিবারকেও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়।


নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, যারা মাদক সেবন করে গাড়ি চালান, তারা শুধু নিজেদের জীবনই ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন না, বরং গাড়িতে থাকা যাত্রীদের জীবনও চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেন। মাদক সেবনের পর একজন চালকের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তার চোখে ঝাপসা দেখা দেয়, রোড ডিভাইডার, রাস্তার সংকেত কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও মনোযোগ থাকে না। মাদক সেবনের ফলে প্রচুর হ্যালুসিনেশন হয়, যা অত্যন্ত ভয়াবহ।


তিনি গাড়িচালকদের নিয়মিত ডোপ টেস্টের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ডোপ টেস্টে কেউ মাদকাসক্ত হিসেবে শনাক্ত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, মাদকের শুরুটা হয় সিগারেট থেকে। ধূমপানের আসক্তিই অনেককে ধীরে ধীরে ভয়ংকর মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। মাদক থেকে মুক্ত থাকতে হলে মানসিকভাবে দৃঢ় হতে হবে এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা আমাদের সবার প্রত্যাশা।


সেমিনারের শুরুতে ভিডিও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হয়। পরে মাদকের ভয়াবহতা এবং সচেতনতামূলক আরেকটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।


সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শারমিন আক্তার বলেন, মাদকের ব্যবসা হলো বিনা পুঁজির ব্যবসা এবং এটি অত্যন্ত লাভজনক। তবে সমাজের জন্য এর ক্ষতিকর প্রভাব কতটা ভয়াবহ, তা কল্পনাও করা যায় না। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি আর পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না।


তিনি বলেন, অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। তাদের সচেতনতাই সন্তানদের মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে এবং তারা কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে- সেদিকে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। মাদক নির্মূলে পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।


অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে শুধু প্রশাসনের পক্ষে একা মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘পুলিশ আপনাদের পাশে আছে। নির্ভয়ে মাদক-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য পুলিশকে জানান। অনেকেই ক্ষতির আশঙ্কায় তথ্য দিতে পিছিয়ে যান। কিন্তু তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখা পুলিশের দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেকেই ভদ্রবেশে মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। শুধু পুরুষ নয়, নারীরাও বড় বড় মাদকের চালান বহন করছে। তবে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বিএম তারিক উজ জামান বলেন, সমাজ সংস্কারকেরা বলেছেন, কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তাদের শিক্ষার বাইরে রাখতে হবে এবং তাদের হাতে মাদক তুলে দিতে হবে। বর্তমানে সমাজে ঠিক তেমনই একটি চিত্র দেখা যাচ্ছে। মাদক আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।


তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেব না। মাদক বিরোধী আন্দোলনের নামে অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি ‘মব’-এর পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। সামাজিক আন্দোলন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বাড়িঘর ভাঙচুর বা তাদের বিতাড়িত করার মতো কর্মকাণ্ড আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ অপরাধী হলে তাকে আইনের হাতে তুলে দিন। আইনই তার যথাযথ বিচার করবে।’
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সময় সমীকরণের প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এম জেনারেল, সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মইনুদ্দিন, গাড়িচালক মনি, আব্দুল করিম, ইশরাকসহ আরও অনেকে।


এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নয়ন কুমার রাজবংশী, সহকারী কমিশনার এস এম আশিস মোমতাজ, টিআই আমিরুল ইসলাম, জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মানিক আকবর, পৌর বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মনিসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের গাড়িচালক, চালক সহকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজন।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)