ছবির ক্যাপশন:
সরকারি নীতিমালা ও গোপনীয়তা রক্ষার তোয়াক্কা না করে চুয়াডাঙ্গা শহরের বিভিন্ন ফটোকপির দোকানে অত্যন্ত অনিরাপদ ও প্রকাশ্যে ছাপানো হচ্ছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। শিক্ষকদের এমন চরম উদাসীনতায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের এই পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গা শহরের বেশ কয়েকটি এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রকাশ্যেই সাধারণ মানুষের সামনেই ফটোকপি করা হচ্ছে বিভিন্ন স্কুলের প্রশ্নপত্র। এর মধ্যে শহরের একটি ব্যস্ততম দোকানে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চুয়াডাঙ্গার গোকুলখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ফটোকপি করা হচ্ছে। কোনো ধরনের গোপনীয়তা রক্ষা না করে সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও পথচারীদের সামনেই এই সংবেদনশীল কাজ চলায় উৎসুক মানুষজনকেও তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে গোকুলখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শফি উদ্দীন টিটু প্রথমে দায়সারাভাবে বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা প্রশ্ন নিজে করি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে (দোকানে) ফটোকপি করতে দিই। আমাদের প্রতিষ্ঠানে কারেন্ট থাকে না। এলাকায় ফটোকপি করতে পারে না। আমাদের ফটোকপির মেশিনও নেই। অন্য স্কুলগুলো বিভিন্নভাবে পায়। আমরা প্রশ্ন নিজেরা করি। প্রশ্ন করে বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানে দিই, পরের দিন পাই। কম্পোজ মেহেরপুরের আছে, গাংনীর আছে, শিক্ষকের কিছু কম্পোজ আছে, বিভিন্ন জায়গার কম্পোজ আছে। আপনি খোঁজ নেন, অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী করে?’
তবে এই প্রতিবেদকের সাথে প্রধান শিক্ষক ও জেলা শিক্ষা অফিসারের কথা বলার প্রায় এক ঘণ্টা পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শফি উদ্দীন টিটু পুনরায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি একজন সচেতন সাংবাদিক। আপনি আমার বিরাট খুব করলেন। আমি ভাই ওই প্রশ্ন ব্যান্ড (বাতিল) করে দিলাম। আমি পুনরায় প্রশ্নপত্র তৈরি করাবো।’
এদিকে, প্রশ্ন বাতিলের ঘোষণা দিলেও সংশ্লিষ্ট ফটোকপি ব্যবসায়ীদের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, গণমাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রধান শিক্ষক ওই ফটোকপি দোকানের পাওনা বিল পরিশোধ করবেন না বলে হুমকি দিয়েছেন, যা নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারি পরিপত্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো পাবলিক বা অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করা বিদ্যালয়ের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা কমিটির আইনি দায়িত্ব। এভাবে অবহেলা ও প্রকাশ্যে প্রশ্ন মুদ্রণ ‘পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’ এর বিধান এবং সরকারি চাকরিজীবী/শিক্ষক আচরণ বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন, যা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা অফিসার জেসমিন আরা খাতুন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পরীক্ষার প্রশ্ন এভাবে বাইরের সাধারণ দোকানে ফটোকপি করার কোনো নিয়ম নেই। এতে প্রশ্নফাঁসের শতভাগ আশঙ্কা থাকে, যা সরকারি নির্দেশনার পরিপন্থী। গোকুলখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় যদি সত্যিই এই নিয়ম লঙ্ঘন করে থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষ বিধি মোতাবেক তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
প্রায় এক ঘণ্টা পর ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা অফিসার জেসমিন আরা খাতুন পুনরায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করে জানান, ‘আমি পুনরায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশ্নপত্র তৈরির ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। এ ধরনের কাজ কোনো প্রতিষ্ঠান করে থাকলে, বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
