ছবির ক্যাপশন:
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। আসন্ন অর্থবছরের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা করছে সরকার। ফলে যাদের বার্ষিক বেতনভিত্তিক আয় ৬ লাখ টাকার কম (বেতনের এক-তৃতীয়াংশ করমুক্ত সুবিধাসহ), তাদের আয়কর দিতে হবে না। আজ সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাসের মাধ্যমে এই সংক্রান্ত পরিবর্তনগুলো চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে।
একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসছে সরকার। নিয়মিত কর দিয়ে জমি-ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের নতুন বিধানও বাতিল করা হচ্ছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় লভ্যাংশ আয়ের ওপর আগের মতোই ২০ শতাংশ করহার বহাল রাখা হচ্ছে। তবে করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে করদাতাদের করের বোঝা খুব বেশি কমছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুযোগ কমানো, ন্যূনতম করহার বৃদ্ধি এবং সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ও সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের ওপর কাটা উৎসে করকে চূড়ান্ত করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার ফলে অনেক করদাতাকেই অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে। জাতীয় সংসদে মঙ্গলবার অর্থবিল-২০২৬ পাসের আগে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শেষ মুহূর্তে এসব সংশোধনী আনছে বলে দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি:
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছিল। এবার মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা আরও ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। অর্থাৎ এক বছরে করমুক্ত সীমা বেড়েছে মোট ৫০ হাজার টাকা। সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
করমুক্ত সীমা বাড়লেও সবার কর কমবে না:
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীদের জন্য ইতিবাচক তবে যাদের আয় ব্যবসা, বাড়িভাড়া, কৃষি বা আর্থিক সম্পদ থেকে আসে, তাদের অনেকেরই কর বেড়ে যেতে পারে। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- ন্যূনতম করহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে; বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের সীমা ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে; কর রেয়াত পেতে বিনিয়োগ মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে এবং সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ও সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের ওপর কাটা উৎসে করকে আর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হবে না; এটি অগ্রিম কর হিসেবে সমন্বয় করতে হবে। ফলে রিটার্ন দাখিলের সময় অনেক করদাতাকে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হতে পারে। ফলে করমুক্ত সীমা বাড়লেও প্রকৃত অর্থে করের চাপ আগের মতোই থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংক হিসাব খুলতে লাগবে না টিআইএন:
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ী সংগঠন, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের আপত্তির মুখে সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে। তাদের মতে, টিআইএন বাধ্যতামূলক করলে নিম্ন আয়ের মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যেতে পারেন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আনতেই এই বিধান প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
জমি-ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের সুযোগ বাতিল:
অর্থবিলে ‘স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন’ নামে একটি একটি নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। এর আওতায় অতীতে দলিলে কম মূল্য দেখিয়ে কেনা জমি বা ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য নিয়মিত কর দিয়ে বৈধভাবে প্রদর্শনের সুযোগ রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে ক্রেতাকে দলিল মূল্য ও প্রকৃত মূল্যের পার্থক্যের ওপর ৩০ শতাংশ এবং বিক্রেতাকে ১৫ শতাংশ মূলধনী কর দেওয়ার বিধান ছিল। তবে বিরোধী মত, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের সমালোচনার মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত এই বিধান পুরোপুরি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শেয়ারবাজারের জন্য স্বস্তি:
প্রস্তাবিত অর্থবিলে লভ্যাংশ আয়ের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ করহার বাতিল করে নিয়মিত করপোরেট করহার আরোপের প্রস্তাব ছিল। এতে তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কার্যকর করহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের জোরালো আপত্তির পর সরকার আগের ২০ শতাংশ করহারই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমতে পারে স্বর্ণের মূলধনী কর:
অর্থবিলে স্বর্ণ, রুপা, গহনা, মূল্যবান পাথর, শিল্পকর্ম, ডিজিটাল মুদ্রাসহ বিভিন্ন সম্পদ বিক্রি থেকে অর্জিত মূলধনী মূলধনী মুনাফার ওপর। ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের মূল্য ব্যাপক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকার এই করহার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করও কমতে পারে:
বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, প্রকৌশল কলেজ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। শেষ মুহূর্তে এই করহার অর্ধেকে নামিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেট ঘোষণার পর ব্যবসায়ী সংগঠন, বিনিয়োগকারী, ব্যাংকার, কর বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন অংশীজনের ব্যাপক আপত্তির মুখে সরকার অর্থবিলে একাধিক সংশোধনী আনতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, টিআইএন বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার এবং জমি-ফ্ল্যাট সংক্রান্ত বিধান বাতিলের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে কর রেয়াত কমানো, ন্যূনতম করহার বৃদ্ধি এবং উৎসে করের নতুন বিধান কার্যকর হলে অনেক করদাতার প্রকৃত করের বোঝা আগের মতোই থেকে যাবে। ফলে করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও সামগ্রিক কর ব্যবস্থায় স্বস্তি কতটা মিলবে, সেটি নির্ভর করবে অর্থবিলের চূড়ান্ত রূপ ও বাস্তবায়নের ওপর।
