ছবির ক্যাপশন:
আলমডাঙ্গা উপজেলার শেষ প্রান্তের জনপদ হাটবোয়ালিয়ার হাটুভাঙ্গা গ্রাম। গ্রামের পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে মাথাভাঙ্গা নদী। নদীর পাড়জুড়ে সারি সারি শুকাতে রাখা মাটির তৈরি সামগ্রী, চাকার ঘূর্ণনে ব্যস্ত কারিগরের হাত আর কাঁচা মাটির গন্ধ, সব মিলিয়ে এখনো যেন জীবন্ত হয়ে আছে বাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। একসময় এই অঞ্চল ছিল মাটির তৈজসপত্র তৈরির জন্য বেশ পরিচিত। হাটুভাঙ্গা গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে ছিল মৃৎশিল্প পেশার সঙ্গে। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশার মাধ্যমেই চলত তাদের সংসার। মাথাভাঙ্গা নদীর তীরবর্তী হওয়ায় এখানকার মাটি ছিল মৃৎশিল্প তৈরির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
সেই মাটি সংগ্রহ করে গ্রামের কারিগররা নিজেদের দক্ষ হাতে তৈরি করতেন হাড়ি, কলস, মালশা, থালা, কুলা, নান্দা, মাটির ব্যাংক, ফুলদানি ও শিশুদের বিভিন্ন খেলনা সামগ্রী। গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এসব মাটির জিনিসপত্র। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে পানি সংরক্ষণ, ধান-চাল রাখাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হতো মাটির তৈরি সামগ্রী। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে মাটির হাড়ি-কলস ছাড়া সংসার কল্পনাই করা যেত না। বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন উৎসবেও মাটির তৈরি জিনিসের ছিল আলাদা কদর। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের তৈরি পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কমতে থাকে মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা।
ফলে এক সময়ের জমজমাট মৃৎশিল্প এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। জীবিকার তাগিদে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন। যারা এখনো এই পেশায় টিকে আছেন, তারা মূলত রিং স্লাব ও নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরি করছেন। বর্তমানে হাটুভাঙ্গা গ্রামের অসংখ্য পরিবার এই মৃৎশিল্পকে কেন্দ্র করেই জীবিকা নির্বাহ করছে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে মাটি সংগ্রহ, মাটি প্রস্তুত, চাকার মাধ্যমে সামগ্রী তৈরি ও রোদে শুকানোর কাজ। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই একসঙ্গে কাজ করেন। কেউ মাটি প্রস্তুত করেন, কেউ তৈরি করেন বিভিন্ন সামগ্রী, আবার কেউ বাজারজাত করার দায়িত্ব পালন করেন।
ফলে এই শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান। মাথাভাঙ্গা নদীর তীরে সারি সারি মাটির তৈরি সামগ্রী শুকানোর দৃশ্য এখনো পথচারীদের নজর কাড়ে। অনেকেই এই দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন। গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে এখনো টিকে আছে এই মৃৎশিল্প।
এ বিষয়ে হাটুভাঙ্গা গ্রামের প্রবীণ রিং সিলাব ব্যবসাহী ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘আগেকার মানুষও নেই, আগের দিনের সেই চাহিদাও নেই। আগে মানুষ মাটির হাড়ি-কলস ছাড়া চলতেই পারত না। এখন প্লাস্টিক আর স্টিলের জিনিসে বাজার ভরে গেছে। তাই হাড়ি, কলস, মালশা, থালা, কুলা, নান্দার মতো পুরোনো ঐতিহ্য যুগের সাথে তাল মিলিয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে এই গ্রামে শত শত পরিবার মাটির জিনিস তৈরি করত। এখন অনেকেই পেশা বদলে অন্য কাজে চলে গেছে। তবুও আমরা পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’ স্থানীয়দের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ।
