ছবির ক্যাপশন:
আদরের ছোট বোন আর ভাগনি মীমকে কথা দিয়েছিলেন—পরবাসের সব মায়া কাটিয়ে খুব শিগ্গির ফিরে আসবেন শেকড়ের টানে। নজরুল ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই চেনা হাসিমুখ নিয়ে নয়; ফিরলেন এক নিথর দেহ হয়ে, কফিনে বন্দি হয়ে। যে মানুষটি বিদেশের মাটিতে সোনার হরিণ ধরতে গিয়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন স্বপ্নের খামার, সেই স্বপ্নই আজ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের গোবরডাঙ্গা গ্রামের আকাশে-বাতাসে হাহাকার হয়ে ঝরছে।
মালয়েশিয়ায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার প্রবাসী নজরুল ইসলামের (৩২) মরদেহ গতকাল শনিবার ভোরে যখন তার নিজ গ্রামে পৌঁছায়, তখন ভোরের আলো ফুটেছে কেবল। কিন্তু পুরো গ্রামে যেন নেমে আসে এক অমানিশার আঁধার। দীর্ঘ ১৮ দিন বিদেশের মর্গে পড়ে থাকার পর নিজের ভিটায় পা রাখলেন নজরুল, তবে প্রাণহীন।
পিতা মোতালেব হোসেন জানান, ২০১৮ সালে পরিবারের অভাব মোচন আর উন্নত জীবনের আশায় বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন নজরুল। কঠোর পরিশ্রমে সেখানে গড়ে তুলেছিলেন একটি সমন্বিত খামার। গরু, ছাগল আর পোষা প্রাণীদের সেই খামারটিই ছিল তার সাফল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু এই সাফল্যই তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল। ব্যাবসায়িক ঈর্ষার বলি হতে হলো এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে। গত ১৪ এপ্রিল দিবাগত রাতে দুর্বৃত্তরা তাকে শুধু কুপিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, পাশবিকতার চরম সীমায় গিয়ে পুড়িয়ে দেয় তার মরদেহ।
এদিকে শনিবার সকাল ১০টায় যখন নজরুলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, তখন উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত। নিজের সন্তানকে হারিয়ে বাবা মোতালেব হোসেন বাগরুদ্ধ। তার কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে চারপাশ। মা’র হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে দাফনের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো ৩৫ হাজার টাকার একটি চেক। কিন্তু মায়ের আর্তনাদ—"টাকা দিয়ে কী হবে? আমার নজরুলরে তো আর কেউ ফেরায় দেবে না!"
নিহতের ভাই জহির উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ভাই আমার সবকিছু গুছিয়ে স্থায়ীভাবে দেশে ফেরার কথা ছিল। সে বলত, 'আর প্রবাসে থাকব না'। অথচ আজ তাকে কবর দিতে হলো।" ভাগনি সাদিয়া ইসলাম মীম ডুকরে কেঁদে উঠে বলছিল, "মামা বলেছিলেন ফিরে এসে আমাদের অনেক সময় দেবেন। মামা তো ফিরলেন, কিন্তু আমাদের সঙ্গে একটা কথাও বললেন না।
কালীগঞ্জ থানার ওসি জেল্লাল হোসেন জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডটি বিদেশে ঘটায় তারা কোনো অভিযোগ পাননি। তবে নজরুলের পরিবার বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন।
