ছবির ক্যাপশন:
আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
একটি ফোনকলের অপেক্ষায় ছিল পুরো পরিবার। কথা ছিল খামারের গরু-ছাগল বিক্রির টাকা নিয়ে দ্রুতই দেশে ফিরবেন রেমিট্যান্স যোদ্ধা নজরুল ইসলাম। বোনকে কথা দিয়েছিলেন, ‘আর কষ্ট করতে হবে না আপা, আমি বাড়ি এসে সব ঠিক করে দেব।’ ভাগ্নি সাদিয়া ইসলাম মিমকে বলেছিলেন, ‘তোমার জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসব, যা দেখে তুমি খুশি হয়ে যাবে।’ কিন্তু প্রিয়জনদের সেই অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো এক বীভৎস দুঃসংবাদে। সুদূর মালয়েশিয়ায় নজরুল ইসলাম (২৯) ও তার বাগদত্তা কোহিনুর বেগমকে (২১) নৃশংসভাবে হত্যার পর পুড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ পেয়ে গোটা পরিবার শোকে কাতর হয়ে পড়েছে।
গত ১৪ এপ্রিল গভীর রাতে ঘটনাটি ঘটেছে মালয়েশিয়ার শ্রীমবাং জেলার কামপুংচুয়া (লকেট) গ্রামে। নিহত নজরুল ইসলাম (২৯) ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গোবরডাঙ্গা গ্রামের মোতালেব মন্ডলের ছোট ছেলে। অন্যদিকে নজরুলের সঙ্গে নিহত তার বাগদত্তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার সেনপাড়ার গ্রামে।
ভাগ্নি সাদিয়া ইসলাম মিম রোববার বিকেলে জানান, তার ছোট মামা জীবনের শেষ সম্বলটুকু গুছিয়ে যখন নাড়ির টানে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের তেঁতুলতলা গ্রামের শান্তি নামে এক প্রবাসী একটি ভিডিও পাঠিয়ে নজরুল ও তার বাগদত্তার মৃত্যুর খবর তাদের অবগত করেন।
ভাগ্নি মিম আরও জানান, তারা এখনো ওই দেশের সরকারের কাছ থেকে মৃত্যুর কোনো সংবাদ পাননি। তবে ঝিনাইদহের যারা মালয়েশিয়ার শ্রীমবাং জেলার কামপুংচুয়া এলাকায় কাজ করেন তারা খবরটি নিশ্চিত হয়েই তাদেরকে জানিয়েছেন।
প্রবাসী নজরুলের ভাই জহির উদ্দীন জানান, ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন নজরুল। সেখানে হাড়ভাঙা খাটুনি আর মেধা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি বৈচিত্র্যময় খামার। হাঁস-মুরগি থেকে শুরু করে গরু-ছাগল ও বিদেশি কুকুর সবই ছিল তার নিবিড় মমতায় ঘেরা। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোহিনুর বেগমের সঙ্গে পরিচয়ের ঘটে নজরুলের। কিছুদিন পর নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সেবা করতে বাংলাদেশে থেকে মালয়েশিয়ায় ছুটে যান বাগদত্তা কোহিনুর।
নজরুলের মা রসুলা বেগম দাবি করেন, ব্যাবসায়িক সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে মালিক অথবা সেদেশের কোনো দুষ্টচক্র তাদের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। এরমধ্যে ব্যাবসায়িক পার্টনারের সঙ্গে বিরোধের কথা নিহত নজরুল আগে থেকেই তার পরিবারের কাছে আভাস দিয়েছিলেন। এ কারণে বারবার নজরুল বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ফেরার আগেই তার মরদেহ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হলো।
এদিকে গোবরডাঙ্গা গ্রামটি এখন শোকে স্তব্ধ। নজরুলের বৃদ্ধ পিতা মোতালেব হোসেন বাগরুদ্ধ। বাড়িতে কান্নার রোল। পিতা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। বোন শাপলা খাতুনের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। প্রতিবেশী ওমর ফারুক বলেন, ‘নজরুল ছিল পরিশ্রমের উজ্জ্বল উদাহরণ। এমন এক তরুণের জীবনে এই নৃশংসতা মেনে নেওয়া যায় না।’
কালীগঞ্জ থানার ওসি জেল্লাল হোসেন জানিয়েছেন, মৃত্যুর খবরটি সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নয়। তবে পরিবারটি কান্নাকাটি করছে। তিনি বলেন, বিদেশে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার বিষয়ে দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়াই এখন প্রধান পথ। ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মাহফুজ আফজাল রোববার সন্ধ্যায় জানান, এ ধারণে কোনো খবর তাদের কাছে নেই, যদি আসে তবে জানাতে পারবো।
