ছবির ক্যাপশন:
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৪০ দিন ধরে চলা যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত যতি টানল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় বৃহত্তর যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে পিছিয়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। শর্তানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করবে আর তেহরান সম্মত হয়েছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে। এদিকে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেও উভয়পক্ষকে আগামীকাল শুক্রবার আলোচনার টেবিলে নিয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ-যাতে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি করা যায়। দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর একে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘসহ রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মিসর, ইরাক, মালয়েশিয়া, জাপান, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার।
শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ইরানের ওপর পূর্বঘোষিত বড় ধরনের বোমাবর্ষণ ও হামলা অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে রাজি হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘একটি পুরো সভ্যতাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া’র হুমকি দিয়ে ট্রাম্পের আলটিমেটামের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার কিছু সময় আগেই এ ঘোষণা এলো। যদিও এ সাময়িক যুদ্ধবিরতির পেছনে একটি কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প লিখেছেন, দুই পক্ষের মধ্যে একটি ‘উভয়মুখী যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে এ স্থগিতাদেশের প্রধান শর্ত হচ্ছে-ইরানকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দেওয়া বিশেষ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতেই ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্প তার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত ‘বিধ্বংসী হামলা’ দুই সপ্তাহের জন্য তিনি স্থগিতে রাজি হয়েছেন। ট্রাম্পের এ নাটকীয় ঘোষণার পেছনে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যস্থতা বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া ১০ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এ প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।’
যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ায় উভয়পক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স পোস্ট করে বলেন, উভয় পক্ষই অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বোঝাপড়ার পরিচয় দিয়েছে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে গঠনমূলকভাবে যুক্ত থেকেছে। শাহবাজ শরিফ বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির যে ঘোষণা দিয়েছে, সেটির ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পরবর্তী আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম বড় কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করেছে পাকিস্তান। এটি সেই সব সংশয়বাদী ও নেতিবাচক মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের ভুল প্রমাণ করেছে; যারা মনে করেছিলেন পাকিস্তানের এমন এক জটিল ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা নেই।’
এদিকে, ইরান নিশ্চিত করেছে, এ দুই সপ্তাহের সময়কালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে দেবে, যা বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের দামের ঊর্ধ্বগতিকে কিছুটা কমাবে। ইসরায়েলও তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষের ওপর হামলা বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে, কারণ ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি নিয়ে একমত হতে পারেনি। আগামীকাল শুক্রবার ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা, যেখানে দেখা যাবে এ যুদ্ধবিরতি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে রূপ নেয় কি না। যুক্তরাষ্ট্র কীসে সম্মত হয়েছে? যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের ওপর সামরিক হামলা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। তারা দাবি করেছে যে তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে এবং ইরান হরমুজ প্রণালী ‘সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক ও নিরাপদভাবে’ খুলতে সম্মত হয়েছে। এ প্রণালী বিশ্বে তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান এটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে ১০ দফা প্রস্তাব পেয়েছে, যা আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি। তিনি বলেন, অতীতের প্রায় সব মতবিরোধের বিষয়েই সমঝোতা হয়েছে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি করা সম্ভব হবে।
১০ দফা প্রস্তাবের বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি, ইরানের সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিয়ন্ত্রিত চলাচল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির স্বীকৃতি, ইরানের ওপর সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থায় সব প্রস্তাব বাতিল, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সব প্রস্তাব বাতিল, অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ইরানকে প্রদান, বিদেশে থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা, এসব বিষয় জাতিসংঘের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা।
তবে ট্রাম্প বলেন, চুক্তি যাই হোক, ইরানের এঞ্জিন নেজদ। ভালোভাবে না না এগোয়, এগোয়, তাহলে সহজেই আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু বলেনি। যেমন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের সম্পদ মুক্ত করা, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ মার্কিন সেনা প্রত্যাহার। এছাড়া ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র কোনো মন্তব্য করেনি, যা আগে বড় ইস্যু ছিল। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার বিষয় নয়। নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।
ইরান শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে- যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা বন্ধ করে, তাহলে ইরানও প্রতিশোধমূলক হামলা বন্ধ রাখবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরানের ওপর হামলা বন্ধ হলে, আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীও প্রতিরক্ষামূলক অভিযান বন্ধ করবে। এছাড়া ইরান-সমর্থিত ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও দুই সপ্তাহের জন্য তাদের হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার আয়োজন করতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। গতকাল বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, তার সরকারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এবং তাদের মিত্ররা ‘সব জায়গায়’ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে।
