ত্রিমুখী চাপে সরকার

আপলোড তারিখঃ 2026-04-01 ইং
ত্রিমুখী চাপে সরকার ছবির ক্যাপশন:

জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি, বৈদেশিক খাতে অস্থিরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংকট- ত্রিমুখী চাপে পড়েছে সরকার। এই চাপ সামাল দেওয়া এখন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এ চাপ সামাল দিতে দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ না করলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে থাকায় সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। এতে বাজেটে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে তেল খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করছে। একইসঙ্গে তেলের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ খাতেও। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ সরকারের কাছে বাড়তি প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।


বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রেশনিং করেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবও দেশের ওপর পড়ছে। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি খাত, শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে। জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং আগের চুক্তিমূল্যে পণ্য পরিবহন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, যা রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লেও আমদানি ব্যয় তুলনামূলক বেশি থাকায় বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও চাপের মুখে রয়েছে। একইসঙ্গে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল না থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকিং খাতে এলসি খোলা এবং আমদানি কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে।


পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও চাপ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার, জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে প্রবাসী আয় বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করার কথাও বলা হচ্ছে।


আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও দেশে আপাতত জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। টানা দ্বিতীয় মাসের মতো এপ্রিলেও ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। বর্তমানে দেশে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলেও ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ এড়াতে সরকার এই দাম অপরিবর্তিত রাখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।


জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু) জানিয়েছেন, বৈশ্বিক বাজারে ডিজেলের দাম প্রায় ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে সরকারের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৯৮ টাকা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য সমন্বয় না করায় বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু জ্বালানি তেল খাতেই প্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে সরকারকে। আন্তর্জাতিক বাজারের এ অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে ভর্তুকির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে যখন অর্থনীতিতে একাধিক চাপ বিদ্যমান। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হবে একটি ‘অগ্নিপরীক্ষা’। বৈশ্বিক সংঘাত, জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা সরকারের নীতিনির্ধারণকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি অর্থনীতিকে আরও নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে।


তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট রাজস্বনীতি, বৈদেশিক খাত ও মুদ্রানীতি একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচির অধীনে দেওয়া সংস্কার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের আইএমএফ শর্ত পূরণ এবং একইসঙ্গে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বজায় রাখার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় হতে পারে- যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একইসঙ্গে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ছে, যা টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাব্য অস্থিরতা। কারণ, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই আসে ওই অঞ্চল থেকে।


ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে বর্তমানে জিডিপির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা ও ব্যয় বৃদ্ধি বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)