ছবির ক্যাপশন:
দীর্ঘ প্রায় দু’যুগ পর আলমডাঙ্গা দুর্লভপুরের ইউপি সদস্য বীর মুুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার হোসেন হত্যা মামলার রায় কার্যকর
নিজস্ব প্রতিবেদক: আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ইউপি সদস্য মনোয়ার হোসেন হত্যা মামলার মামলার দীর্ঘ ২৩ বছর পর ২ আসামির ফাঁসির রায়ে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি নেতা মোকিম ও ঝড়–কে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে। ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আব্দুল মোকিম চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার দুর্লভপুরের মৃত মুরাদ আলীর ছেলে এবং গোলাম রসূল ঝড়– একই গ্রামের মৃত আকছেদ আলীর ছেলে। গতকাল বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ১১টা ৪৫মিনিটে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির মঞ্চে তাদের মৃত্যদন্ড কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার কামাল হোসেন। এদিকে, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ঝড়–র লাশ গ্রহন করতে যান তার ছেলে তরিকুল ইসলাম। তিনি বেতবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামেই ঝড়–র লাশ দাফন করা হবে বলে জানা গেছে। তবে পারিবারিক মতানৈক্যের কারণে লাশ কোথায় দাফন হবে তার সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। অপরদিকে, মকিমের লাশ গ্রহন করবে তার ছেলে মখলেছ আলী। তিনি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ভোলাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামেই মকিমের লাশ দাফন করার খবর পাওয়া গেছে।
কারাসূত্রে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী জল্লাদ মশিয়ার লিভার টেনে ফাঁসি কার্যকরের পর ওই দড়িতেই তাদের দেহ ২০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখেন। এরপর মৃত্যু নিশ্চিতকারী দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. তারেক সকল প্রক্রিয়া শেষে তাদের দু’জনকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় যশোর জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন, পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায়, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কে.এম মামুন উজ্জামান, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার কামাল হোসেন, জেলার আবু তালেব, ডেপুটি জেলার সৈয়দ হাসান আলী, ফয়েজ-উর রহমান, কারা সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর আব্দলু বারীসহ দায়িত্বরত কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ফাঁসি কার্যকরের পর আব্দুল মোকিমের লাশ গ্রহণ করেন তার ছেলে মখলেছ আলী এবং গোলাম রসূল ঝড়ুর লাশ গ্রহণ করেন তার ছেলে তরিকুল ইসলাম।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, আইনানুগ সকল ফর্মালিটি শেষে ফাঁসির আসামীদেরকে নিয়ে আসা হয় কনডেম সেলে। মাথায় লাল টুপি পরিয়ে এখানে কয়েকদিন রাখা হয়। তার সাথে যথাসম্ভব ভালো ব্যবহার করা হয়। এরমধ্যে বিদেশ থেকে আনা হয় দড়ি। জার্মানি থেকে বিশেষ এই দড়ি আনা হয়। নিয়ম করে কয়েকবার এতে মাখানো হয় সবরি কলা আর মাখন। জল্লাদ নির্বাচন করা হয় কয়েদিদের মধ্য থেকেই। এ ফাঁসি কার্যকরের জন্য যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত আসামী জল্লাদ মশিয়ারসহ অপর দু’জন জল্লাদের ২ মাস করে সাজা কমিয়ে আনা হবে। আসামীর সম-ওজনের বালির বস্তা দিয়ে কয়েকবার ফাঁসির প্র্যাকটিস করা হয় কয়েকদিন আগেই। বৃহস্পতিবার সকালে কনডেম সেলে আসামীর আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করানো হয়। তবে কবে ফাঁসি কার্যকর হবে তা আসামী এবং আত্মীয়-স্বজন কাউকেই বুঝতে দেয়া হয়নি। বৃহস্পতিবার দিনগত রাতে ফাঁসি কার্যকরের আগে তাদেরকে রাতের খাবার খাওয়ানোর পর গোসল করতে বলা হয়। সে অনুযায়ী তারা নিজেরাই খাওয়া ও গোসল সম্পন্ন করে। রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার দিকে কারাগার মসজিদের ইমাম রমজান আলীকে সাথে নিয়ে জেল সুপার কামাল হোসেন কনডেম সেলে যান। রাত ১১টার মধ্যে তাদের তওবা পড়ানোর কাজ শেষ হলে নেওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চে। জল্লাদ মশিয়ারসহ তিনজন জল্লাদ তাদের দু’জনকে কালো কাপড়ের জম টুপি পরান। পূর্ব নির্ধারিত ঠিক রাত ১১টা ৪৫মিনিটে জেল সুপারের হাত থেকে রুমাল মাটিতে পড়ার সাথে সাথে ফাঁসির দড়ির লিভার টেনে ফাঁসি কার্যকর করেন জল্লাদ মশিয়ার। দু’জনের ফাঁসি উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে সাধারণ দর্শনার্থীসহ সাংবাকিদেরও কারা ফটকে ঢোকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন কারা কর্তৃপক্ষ। কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিকাল থেকে কারা প্রাঙ্গনে বাড়তি নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করা হয়।
কারাসূত্রে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের ২৮ জুন খুন হন আলমডাঙ্গা উপজেলার দুর্লভপুর গ্রামের বাসিন্দা ও তৎকালীন ইউপি সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার হোসেন। ওই ঘটনায় মোকিম ও ঝড়ুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০০৮ সালের ১৭ এপ্রিল দুই আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেন চুয়াডাঙ্গা জেলা ও দায়রা জজ আদালত। রায়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আপিল করে দ-িত দুই আসামি। হাইকোর্ট ফাঁসির রায় বহাল রাখায় পরে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে আসামিরা। সেখানেও রায় বহাল রাখার আদেশ দেন বিচারক। পরে দুই আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেও সাড়া পাননি।
কারাসূত্র আরো জানায়, প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখান হওয়ার পর আইনানুযায়ী ফাঁসির প্রস্তুতি শুরু হয়। ফাঁসি কার্যকর করতে তিন জল্লাদকে প্রস্তুত করা হয়।
এ ব্যাপারে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সুপার কামাল হোসেন বলেন, ‘সোয়া ১১টার দিকে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জন কারাগারে প্রবেশ করেন। পৌনে ১২টায় দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়।’
এদিকে দীর্ঘ প্রায় দু’যুগ পর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর নিহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার মেম্বারের পরিবারের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে তাঁর স্ত্রী চায়না খাতুন বলেন, দীর্ঘদিন পর হলেও আমরা সুষ্ঠু বিচার পেয়েছি। আসামীদের ফাঁসির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কলঙ্ক মুক্ত হলো। হত্যা মামলাটির ন্যায্য বিচার পাওয়ায় আমরা আনন্দিত। এক সময় বছরের পর বছর আমরা চোখের জলে বুক ভাসিয়েছি। আল্লাহ মুখ তুলে তাকিয়েছেন। আল্লাহর কাছে হাজার শোকর; খুনি দুইজনের ফাঁসি হয়েছে। এখন খুনির আত্মীয়দের কান্নার পালা।
নিহত মুক্তিযোদ্ধার মেজ ছেলে ইউপি মেম্বর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার নিরাপরাধ পিতার হত্যার বিচার চেয়ে চরমপন্থীদের হুমকি সহ্য করেছি। পিতার হত্যার বিচার পেয়েছি এতেই আমরা খুশি। হত্যা মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা অহিম উদ্দীন বলেন, ‘একসঙ্গে দুই ভাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম। সেই ভাইকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ভাইকে হারিয়ে নীরবে কেঁদেছি। দেরিতে হলেও খুনিদের ফাঁসি হওয়ার সংবাদ শুনে ভালো লাগছে।’
উল্লেখ্য, চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার হোসেন দু’বার ইউপি মেম্বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। সফল খেলোয়াড় হিসেবেও তিনি কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি দেশ বিদেশে তার কৌশল দিয়ে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা হা-ডু-ডু খেলা করে নিজেকে সফল ক্রীড়াবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির কতিপয় চরমপন্থীরা ১৯৯৪ সালের ২৮ জুন নিজ গ্রামের বাদল সর্দ্দারের বাড়িতে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যার দিনই বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার মেম্বারের ভাই অহিম উদ্দীন বাদি হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় ২১ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ এক যুগ মামলা চলার পর ২০০৬ সালে এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। দুর্লভপুরের মৃত মুরাদ আলীর ছেলে আব্দুল মোকিম ও একই গ্রামের মৃত আকছেদ আলীর ছেলে ঝড়–সহ ৩ জনকে মৃত্যুদন্ডাদেশ ও একই গ্রামের মৃত কুদরত আলীর ছেলে আমিরুল ইসলাল, আবু বক্করের ছেলে হিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দিয়ে আদালত রায় ঘোষণা করে। মামলার বাকি ১৬ জন আসামিকে হত্যার সাথে সম্পৃক্ততা না থাকার প্রমাণ পাওয়ায় তারা বেকসুর খালাস পায়। পরবর্তীতে দন্ডপ্রাপ্ত আসামীরা উচ্চ আদালতে আপিল করলে ফাঁসির দন্ডাদেশপ্রাপ্ত একজন ও যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ২ জন আমিরুল ইসলাম ও হিয়ার দন্ডাদেশ মওকুফ করে আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগেও মোকিম ও ঝড়–র ফাঁসির দন্ডাদেশ বহাল রেখে রায় প্রদান করে। দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পর শুক্রবার রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে মোকিম ও ঝড়ুকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।
