গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

আপলোড তারিখঃ 2026-03-17 ইং
গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিগন্ত ছবির ক্যাপশন:

নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুনভাবে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার এখন দেশের কৃষিজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। দায়িত্ব নেয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যে তারা গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্জাগরণের একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘খাল খনন কর্মসূচি-২০২৬’। গতকাল সোমবার দিনাজপুর জেলার কাহারোল থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশে খাল খননের উদ্যোগ নতুন নয়। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গ্রামীণ উন্নয়ন এবং কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়াতে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। সে সময় প্রায় তিন হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে চালু করা হয় ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচিও। সরকার বলছে, অতীতের সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হয়।


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন, আগামী পাঁচ বছরে সমগ্র বাংলাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষিজীবী মানুষের সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, বেকার যুবক ওনারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সাধারণ মানুষের আয় দ্বিগুণ করা। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করান, নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের চার কোটি পরিবারের মা-বোনদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে ইতোমধ্যে ৩৭ হাজার মায়ের কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এছাড়া কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে তিনি জানান, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় কৃষিপ্রধান এলাকা। এখানে বেকার যুবক ও নারীদের জন্য ইপিজেডে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ঈদের পর সরকারি পর্যায়ে বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হবে।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘কৃষক ভালো থাকলে দেশের মানুষ ভালো থাকবে।’ বর্তমান সময়ে যারা দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যেতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ- সবার আগে বাংলাদেশ।’ খাল খননসহ কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার আশা করছে দেশের কৃষিজীবীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশগত ও সামাজিক উন্নয়নে বড় অবদান থাকবে।


খাল খননের প্রধান সুবিধাসমূহ:
আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক কৃষি: সরকার খাল কেটে শুধু পানির সংরক্ষণই করবে না, বরং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনায় সেচ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, ফলন বাড়বে। বহুমাত্রিক গ্রামীণ অর্থনীতি: খালে সারা বছর পানি থাকলে শুধুমাত্র কৃষিতে নয়, মাছচাষ ও হাঁস পালনেও লাভবান হবে। এতে যুবকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং প্রোটিনের চাহিদা মেটাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা: দিনাজপুরের সাহাপাড়া খালের ১২ কিলোমিটারের খননের ফলে সেখানকার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ বর্ষার অতিরিক্ত বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে। পরিবেশের ভারসাম্য ও বনায়ন: খাল খননের পাশাপাশি পাড় সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ করা হবে। এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষা করবে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।


প্রথম ধাপে দেশের ৫৪টি জেলায় কর্মসূচি শুরু হচ্ছে, যা পানিসম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং বিএডিসির যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়ন হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, প্রকল্পটি কেবল কাগজে-কলমে থেমে থাকলে বা রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হলে এর সুফল পাওয়া যাবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, খাল খননের প্রকল্পে যদি দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তবে এর উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে খাল দখল বা দূষণ করলে প্রকল্পের সুফল কমে যাবে।


প্রধানমন্ত্রীর দিনাজপুর সফর : নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন এবং পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর এলাকার সাহাপাড়ায় একটি খাল খননের মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি এই কর্মসূচির সূচনা করেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে দেশের ৫৪টি জেলায় একযোগে খাল খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে প্রতীকীভাবে খনন কাজের সূচনা করেন। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সোমবার সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সড়কপথে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া এলাকায় গিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।


উদ্বোধনকে ঘিরে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষি সেচে সমস্যা হচ্ছিল। নতুন করে খাল খনন হলে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা যাবে এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচ দেয়া সহজ হবে বলে আশা করছেন তারা। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল, নালা এবং জলাধার খনন ও পুনঃখনন করা হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।


উৎপাদনমুখী সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি:
সবুজ বিপ্লব ও স্বনির্ভরতা: খালের মাধ্যমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় পূর্বে বছরে মাত্র একবার ফসল ফলানো যেত, সেখানে একাধিক ফসল সম্ভব হয়ে ওঠে। খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হয়। খরা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ: বর্ষায় অতিরিক্ত পানি খাল দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রকোপ কমে যায়। শুষ্ক মৌসুমে সেই সংরক্ষিত পানির মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়। গ্রামীণ কর্মসংস্থান: খাল খননে স্থানীয় মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটে, যা নগদ অর্থ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। তখনকার ভঙ্গুর গ্রামীণ অর্থনীতিতে এটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। সময়ের সঙ্গে জিয়ার খালগুলো আজ অনেকখানি ভরাট বা অবৈধ দখলে চলে গেছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসম সময়ে বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।
সর্বোপরি, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষি খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে খননের পর খালগুলোর দখলমুক্ত রাখা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তারা।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)