ছবির ক্যাপশন:
জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ ইউনিয়নে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হাফিজুর রহমান (৫০) মারা গেছেন। গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে রাজধানীর কাকরাইলে একটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় সংঘর্ষে তিনি গুরুতর আহত হন। ওই সংঘর্ষে জামায়াতের ইউনিয়ন আমির ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ উভয় পক্ষের অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেলেও থানা-পুলিশ মুখ খুলছে না।
এদিকে, গতকাল দুপুর ১২টায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে বিকেল সাড়ে চারটায় সুটিয়া ঈদগাহ ময়দানের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে হাফিজুর রহমানকে দাফন করা হয়। হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর প্রতিবাদে গতকাল বেলা ১১টায় জীবননগরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জামায়াতে ইসলামী। পরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারে যদি প্রশাসন ব্যর্থ হয়, তাহলে কাল থেকে কঠোর আন্দোলন করা হবে। হাফিজের খুনিদের হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবে না।
এদিকে, আজ সোমবার বেলা দুইটায় বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। যোহর নামাজের পর জীবননগর উপজেলা পাইলট হাইস্কুল সংলগ্ন মসজিদ হতে এই বিক্ষোভ মিছিলটি বের হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরদিন সুটিয়া স্কুলমাঠে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মেহেদী হাসানকে মারধর করা হয়। পরে জীবননগর থানা-পুলিশ তাকে উদ্ধার করে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে যশোর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই ঘটনার মীমাংসার জন্য গত শনিবার ইফতারের পর হাসাদাহ বাজারে বসার কথা ছিল। তবে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। এসময় হাসাদাহ ইউনিয়ন জামায়াতের ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী মাওলানা ইসরাইল হুসাইন এবং পার্শ্ববর্তী বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের যুব বিভাগের নেতা সুটিয়া গ্রামের সোহাগের সঙ্গে মেহেদী ও তার বাবা জসীম উদ্দিনের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়।
তারা আরও জানান, এর কিছু সময় পর মাওলানা ইসরাইল হুসাইন ও সোহাগ হাসাদাহ মডেল কামিল (এমএ) মাদ্রাসার সামনে অবস্থিত মেহেদীর বাড়িতে হামলা চালান। এসময় মেহেদী ও তার বাবাকে মারধর করা হয়। পরে মেহেদীর স্বজনরা ঘটনাস্থলে এসে তাদের ধাওয়া দিলে তারা সরে যান। কিছুক্ষণ পর আবারও সংঘর্ষ বাঁধে। এসময় মফিজুর রহমানের ওপর হামলা হলে তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান তার বড় ভাই হাফিজুর রহমান। তখন হামলাকারীরা হাফিজুর রহমানকেও মারধর করে। পরে আহতদের জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে মফিজুর রহমান ও হাফিজুর রহমানের অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে যশোর এবং পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে রাত দুইটার দিকে হাফিজুর রহমানের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় জামায়াতের আহত অন্যরা হলেন- বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ও সুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মফিজুর রহমান (৪৫), খায়রুল ইসলাম (৫০) ও সোহাগ (৩৫)। তাদের মধ্যে দুজন জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছেন। আর মফিজুর রহমানকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সংঘর্ষে বিএনপির তিনজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন- সদ্য বহিষ্কৃত হাসাদাহ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান (৪০) এবং তার বাবা জসীম উদ্দিন (৬৫) ও বাঁকা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম মাস্টার (৫০)।
এদিকে, শনিবার সন্ধ্যায় হাসাদাহ বাজারে বিএনপির দুজন আহত হওয়ার পর রাত ১২টার দিকে বাঁকা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জীবননগর থানায় জামায়াত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গেলে পুলিশের সামনেই তার ওপর হামলা হয়। এসময় থানার ওসি সোলায়মান সেখ ফোর্স নিয়ে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আহত মেহেদী হাসান গত শনিবার রাতে বলেন, ‘আমি বাজার করতে গিয়েছিলাম। এসময় আমার আব্বা ফোন করে বলেন, জামায়াতের লোকজন বাড়িতে আক্রমণ করেছে। এসে দেখি আমার আব্বাকে মারধর করা হচ্ছে। এসময় মাওলানা ইসরাইলের নেতৃত্বে সোহাগ এসে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে আমার মুখে কোপ মারে। আমাদের বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে।’
তার বাবা জসীম উদ্দিন শনিবার রাতে বলেন, ‘আমি মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন ইসরাইল হুজুর বেশ কয়েকজনকে নিয়ে ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিয়ে হামলা শুরু করে। আমি বলেছিলাম, আগে কথা শোনো। কিন্তু তারা কিছু না শুনেই আমাকে মারধর করে। পরে সুটিয়ার এক ছেলে ও সোহাগ মারধর করে। এরপর আমার ছেলে এলে তাকেও মারধর করা হয়। তাদের হাতে রামদা, হকিস্টিক ও চাইনিজ কুড়াল ছিল।’
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘বিএনপির লোকজন আমাদের নিরীহ নেতা-কর্মীদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’
জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোলায়মান সেখ বলেন, হাসাদাহে দুই পক্ষের সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
এ বিষয়ে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (দামুড়হুদা ও জীবননগর সার্কেল) মো. আনোয়ারুল কবীর বলেন, থানায় হামলার বিষয়ে যে কথা উঠেছে, সেখানে জসিম নামে একজনকে আগে পুলিশ আটক করেছিল। পরে আরেকজন থানায় গেলে জামায়াতের কিছু লোক তাকে জাপটে ধরেছিল বলে তিনি শুনেছেন। বিষয়টি ওসি তাকে জানিয়েছেন। পরবর্তীতে দুজনকেই ৫৪ ধারায় চালান দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, বর্তমানে যে এজাহার দায়ের হয়েছে, তাতে ওই দুজনই এজাহারভুক্ত আসামি। একজন ৬ নম্বর এবং অন্যজন ৯ নম্বর আসামি।
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, হাসাদাহের ঘটনায় রোববার সন্ধ্যার পর এজাহার দেওয়া হয়েছে। মামলা রেকর্ডের প্রক্রিয়া চলছে। আসামির সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এজাহার দেখে নিশ্চিত হতে হবে। তবে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, সেখানে ৯ জন এজাহারভুক্ত আসামি এবং আরও ৭-৮ জন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে। তিনি বলেন, একজনের মৃত্যু হওয়ায় এটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।
