ছবির ক্যাপশন:
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে ‘কল্যাণমুখী, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে ৫১ দফায় ৯টি প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার ঘোষিত ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এর আলোকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ (জিরো টলারেন্স) নীতি, একটি মানবিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণে জনগণের সামনে নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো তুলে ধরেন। তারেক রহমানের হাত ধরে নতুন পথরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুসে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই ইশতেহারে ‘করব কাজ, গরব দেশ’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে আগামী দিনে ক্ষমতায় গেলে ইশতেহারে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। ইশতেহারকে রাষ্ট্রসংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রগঠন, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন, আঞ্চলিক সুষম উন্নয়ন ও ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ৫টি ভাগে বিভক্ত করেছে।
আসন্ন নির্বাচনে তারেক রহমান দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এটিই তার প্রথম ইশতেহার। ইশতেহার ঘোষণার আগে ও পরে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনায় দলটির অঙ্গীকার তুলে ধরে একটি ভিডিও উপস্থাপনা করা হয়। এতে নির্বাচনে জয়ী হলে দলটির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়। বিকাল ৩টা ৩২ মিনিটে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। পরে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রদুতসহ ৩৮টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কবি, সাহিত্যিক, লেখক বুদ্ধিজীবী এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উপস্থিত ছিলেন। তারেক রহমান দলের ইশতেহার ঘোষণা করেন। এতে বিএনপির ইশতেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ফারমার্স কার্ড চালু, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি ইনসাফ-ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সুদৃঢ় অঙ্গীকার, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করা, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ জিডিপির ০ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রচেষ্টা, দেশকে ২০৩৪ সালে এভিয়েশন হাবে রূপান্তর, বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরণপোষণের আইন বাস্তবায়ন, কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস প্রদান, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় বিশেষ সেল, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করাসহ বিভিন্ন লক্ষ্যের রোডম্যাপ তুলে ধরা হয়েছে।
৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি:
বিএনপির ইশতেহারে যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো-১. প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। ২. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবিমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন। ৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সমপ্রসারণ করা হবে। ৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।
৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। ৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলাুউপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সমপ্রসারণ করা হবে। ৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদীুখালখনন ও পুনঃখনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। ৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সমপ্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। ৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিষ্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সমপ্রসারণ করা হবে। বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যত্তাএই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। বিএনপি বলছে, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে তারা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবেন, সবার আগে বাংলাদেশ।
ইশতেহারে ৩ মৌলিক ভিত্তি:
তিনটি মৌলিক ভিত্তির ওপর বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করা হয়েছে বলে ইশতেহারের মুখবন্ধে বলা হয়েছে। তিনটি মৌলিক বিষয় হলো- শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্রদর্শন, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং চেয়ারম্যান বিএনপির তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এই ধারাবাহিকতাই বিএনপির রাজনীতির মৌলিক ভিত্তি। বিএনপির রাজনীতি স্লোগান নির্ভর নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ভিত্তিক। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাপক সামাজিক পরিকল্পনা মানুষের কর্মসংস্থান, সুশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, সুষম উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, আইনের শাসন এবং সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে বাস্তব উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। এই প্রেক্ষাপটে, চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ডব যধাব ধ ঢ়ষধহ আলোকে বিএনপি একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা হবে।
ইশতেহারে ৫১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার:
ক্ষমতায় গেলে আগামী ৫ বছরে ইশতেহারে ৫১ টি দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। এতে গণতন্ত্র; মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান; সাংবিধানিক সংস্কার, জাতিগঠন; সুশাসন (দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ); স্থানীয় সরকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। সেখানে দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষক, কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান, যুব উন্নয়ন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শ্রম ও শ্রমিক কল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী, সামাজিক ব্যাধির সমস্যা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, পানিসম্পদ পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পররাষ্ট্রনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারের তৃতীয় ভাগে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বিএনপি। এতে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন- ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ, বেসরকারি খাত উন্নয়ন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানখাত সংস্কার, পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সমপ্রসারণ, শিল্পখাত, কারু ও হস্তশিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, সেবাখাত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও পরিবহন খাত, সুনীল অর্থনীতি, সৃজনশীল অর্থনীতির উন্নয়ন, রাজস্ব আয় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহারের চতুর্থ ভাগে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। এতে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী প্রতিষ্ঠা, উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন, হাওড়-বাওড় অঞ্চলের উন্নয়ন, উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, নগরায়ণ ও আবাসন, পর্যটন খাত এবং নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা বিনির্মাণ বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। পঞ্চম অধ্যায়ে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। এতে ধর্মীয় সমপ্রীতি, পাহাড় ও সমতলের নৃগোষ্ঠী, ক্রীড়া, গণমাধ্যম, শিল্প ও সংস্কৃতি, নৈতিকতার শক্তি পুনরুদ্ধারের ৫ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর ও উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি করা হবে:
আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি করতে চায় বিএনপি। একইসাথে সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে দলটি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত ইশতেহারে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। ইশতেহারের রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার অংশে বলা হয়েছে, সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অগণতান্ত্রিক সংশোধনী বাতিল, ৩১ দফার ভিত্তিতে সংস্কার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃজন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার করবে দলটি।
২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে চায়:
দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠনে বেশকিছু পরিকল্পনা নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরেছে বিএনপি। ঘোষিত এ ইশতেহারে দেশের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে বলে জানানো হয়েছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করা বিএনপির লক্ষ্য। যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। এ রোডম্যাপ অনুযায়ী বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ জিডিপির ০ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার চেষ্টা করবে দলটি। অর্থনীতিতে অলিগার্কিক কাঠামো ভেঙে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছে বিএনপি। ইশতেহারে বলা হয়েছে, এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের প্রকৃত অংশীদারত্ব থাকবে। ন্যায্য মূল্য বণ্টন, অর্থায়ন ও বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে এই এজেন্ডার মূল প্রতিশ্রুতি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়ার কথা জানিয়ে বিএনপি বলেছে, ঋণ-নির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরই হবে দলটির মূল লক্ষ্য। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি হবে চালিকাশক্তি। দেশে কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকারও করা হয়েছে ইশতেহারে। বলা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হয়রানি ও জটিলতা নিরসনকল্পে সিঙ্গেল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ান স্টপ সার্ভিস এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর্মপ্রবাহ তৈরি করা হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইনের শাসন ও নিয়মভিত্তিক ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা এবং পুঁজি প্রবাহের মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার মাধ্যমে দেশীয় ও বৈশ্বিকভাবে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা হবে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অধীনে একটি ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালু করা হবে, যেখানে সব অনুমোদন ও নিবন্ধন এক জায়গায় প্রদান করা হবে। কোম্পানি নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এবং ওয়ার্ক পারমিট সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সার্বক্ষণিক হেল্পডেস্ক ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট সহজীকরণ করে তা ১০ দিনের মধ্যে দেওয়া হবে। এছাড়া, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, অযৌক্তিক কর সংস্কার ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম সহজীকরণের অঙ্গীকার করেছে দলটি। কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, আইটি ও ডিজিটাল সার্ভিস, ওষুধ উৎপাদন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়াজাত পণ্য, সৃজনশীল খাত (চলচ্চিত্র, সংগীত, শিল্প, ডিজাইন) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি।
ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানখাত সংস্কার, বেসরকারি খাত উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠন, ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট সম্পাদন, রপ্তানিপণ্যের বৈচিত্রায়ন ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্বারোপ, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে (অ্যামাজন, ই-বে, আলীবাবা) সংযুক্তি, লজিস্টিকস হাব প্রতিষ্ঠা, বন্ধ শিল্প চালুর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।
বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’:
ইশতেহারে বলা হয়,আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ নীতি ধরেই আগামীতে পথ চলবে বিএনপি। এতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির অঙ্গীকার করা হয়, যেখানে সব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততায় জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইশতেহারে বিএনপি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে ‘বন্ধু আছে, প্রভু নেই। দলটি জোর দিয়ে বলেছে, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের কল্যাণ-এই বিষয়গুলোই তাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে।’
