নির্বাচন ঘিরে ষড়যন্ত্রের ছক

রাষ্ট্রযন্ত্রে অদৃশ্যে তৎপরতা, প্রশাসনে বিভক্তির আশঙ্কা

আপলোড তারিখঃ 2025-11-27 ইং
নির্বাচন ঘিরে ষড়যন্ত্রের ছক ছবির ক্যাপশন:

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আবারও অস্থিরতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি প্রশাসনের ভেতরে নীরব স্রোতের মতো চলা অদৃশ্য তৎপরতা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠছে-দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিস্ট আ.লীগের ঘনিষ্ঠ একদল আমলা এবং সাম্প্রতিক জুলাই-পরবর্তী পরিবর্তনে অবস্থান হারানোর আশঙ্কায় থাকা আরেকটি গোষ্ঠী নির্বাচনের আগে প্রশাসনের অভ্যন্তরে একটি গোপন প্রতিরোধ কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতাকে দুর্বল করে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসনের ভূমিকা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক শাসন কিংবা গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার-সব ক্ষেত্রেই আমলাতন্ত্র বিভিন্ন মাত্রায় সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনের অবস্থান সবচেয়ে বেশি আলোচিত। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, রাষ্ট্রযন্ত্র নিরপেক্ষ না থাকলে কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্যতা পায় না, বরং তা নতুন সংকটের জন্ম দেয়।


বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের ভেতরে দুই ধরনের প্রবাহ সক্রিয়। প্রথমত, গত ১৬ বছরে ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে সুবিধাভোগী একদল কর্মকর্তা এখনও সেই প্রভাব ধরে রাখতে চাইছেন। তাদের কেউ কেউ রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রশাসনিক দায়িত্বের ওপরে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে সমালোচনা রয়েছে। দীর্ঘদিন একই ধরনের কর্তৃত্ববাদী পরিবেশে কাজ করার ফলে তারা গণতান্ত্রিক বিধান ও জবাবদিহির সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, জুলাইয়ের পরিবর্তনের পর প্রশাসনের কিছু অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ভেবে একটি নীরব প্রতিরোধ মানসিকতা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি প্রবাহ মিলে একটি গোপন প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।


রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ক্ষমতাসীন দল অতীতের মতো প্রকাশ্য দমননীতির বদলে এবার আরও কৌশলগত ও নীরব পদ্ধতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করতে চাইছে। নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসারদের ওপর অঘোষিত চাপ, মাঠ প্রশাসনের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করা, নিরাপত্তা বাহিনীকে নীরব উপায়ে ব্যবহার করে ভোটারদের মনে অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করা-এসব অভিযোগ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর পাশাপাশি জুলাই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ওপর প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করার কথাও শোনা যাচ্ছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ফারহানা ইসলাম বলেন, প্রশাসনের ভেতরে যে অংশ দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীদের ঘনিষ্ঠ ছিল, তারা শুধু আমলা হিসেবেই কাজ করছে না; বরং রাজনৈতিক খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের আগে তাদের ভূমিকা যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাবেক সচিব হুমায়ুন কবির মনে করেন, রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিরপেক্ষ রাখা ছাড়া গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনের ভেতরে একটি গোপন প্রতিরোধ মনোভাব তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে ও দীর্ঘমেয়াদে অচলাবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই লিখছেন, প্রশাসনের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি হলে ভোটাধিকার আবারও হুমকির মুখে পড়বে। ১৬ বছর ধরে ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সুবিধাভোগী যারা লুটপাট ও অব্যাহত দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি ছিলেন, তারা এখন নতুন পদ্ধতিতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে-এমন মন্তব্যও দেখা যাচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো বলছে, মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের আচরণ দিন দিন দ্বিমুখী হয়ে উঠছে। কোথাও অতিরিক্ত সক্রিয়তা, কোথাও রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা-এ দুই মিলিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার একটি চেষ্টা স্পষ্ট। তাদের দাবি, এই অস্বচ্ছ পরিবেশ দেশের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের ভেতরে যদি এই রাজনৈতিক-ধর্মী প্রবাহ সক্রিয় থাকে, তবে নির্বাচনী দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তারা নিরপেক্ষতা হারাবেন। এর ফলে জনগণ ভোটের প্রতি আস্থা হারাবে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়বে এবং পরিস্থিতি সহিংসতার দিকে গড়াতে পারে।


আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে গভীর আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো বহুবার নিরপেক্ষ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। প্রশাসনের ভেতরে ষড়যন্ত্র বা বিদ্রোহের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ জরুরি। প্রশাসনের অভ্যন্তরে থাকা অদৃশ্য নেটওয়ার্ক দ্রুত শনাক্ত করে নিষ্ক্রিয় করতে হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনের ওপর অযাচিত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একধরনের বিশেষ তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থাকে নির্বিঘ্নে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র নিরপেক্ষ না থাকলে কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হবে না, আর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি দুটোই বাধাগ্রস্ত হবে। অভিযোগ অনুযায়ী প্রশাসনের ভেতরে যদি সত্যিই এমন নীরব তৎপরতা চালু থাকে, তবে তা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠবে। এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে-রাষ্ট্রযন্ত্রকে কতটা মুক্ত রাখা যায় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কতটা অক্ষত রাখা সম্ভব হয়। অন্যথায় নির্বাচনের নামে নতুন সংকটই সামনে এসে দাঁড়াবে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)