ফিরে এলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ

আপলোড তারিখঃ 2025-11-21 ইং
ফিরে এলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছবির ক্যাপশন:

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সংবিধানে ফিরে এলো নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। ২৯ বছর আগে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মধ্যদিয়ে সংবিধানে এই সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল। গণতন্ত্রকে সুসংহত ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় ১৪ বছর পর পূর্বের রায় বাতিল করে আপিল বিভাগ সংবিধানে ফিরিয়ে আনল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বৃহস্পতিবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার রায় দেন।


ঘোষিত রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে অতীতে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় ও মামলার নথি আমরা পর্যালোচনা করেছি। পর্যালোচনায় এটা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়েছে যে ঐ রায়টি ছিল একাধিক ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ। সে কারণে অতীতের আপিল বিভাগের দেওয়া রায়টি আমরা সর্বসম্মতিক্রমে বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সেটা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে সংবিধানে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। তবে আপিল বিভাগ বলেছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত সংবিধানের বিধানাবলি কেবল ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতেই কার্যকর হবে। প্রধান বিচারপতি ছাড়াও আপিল বেঞ্চের সদস্য বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এসএম এমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব সর্বসম্মতিক্রমে এ রায় দেন।
আইনজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে যেহেতু সংসদ নাই, সে জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। আর চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে। রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম আসাদুজ্জামান বলেছেন, আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল হলো। এটা কার্যকর হবে পরবর্তী সংসদ ভাঙার পরের ১৫ দিনের মধ্যে।

যেভাবে অন্তর্ভুক্তি ও বাতিল :
বিরোধী দলগুলোর তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। যেখানে বলা হয়েছিল, নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে। যার প্রধান কাজ হবে পরবর্তী তিন মাস বা ৯০ দিনের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা। এই সরকারব্যবস্থার অধীনে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উভয় নির্বাচনেই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব হয়েছিল। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন- এটা নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। ক্ষমতা গ্রহণ করে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যা ১/১১ সরকার নামে পরিচিতি পায়। এই সরকার দীর্ঘ দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। ওয়ান- ইলেভেনের সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল চেয়ে আপিল করেন রিটকারী পক্ষ। শুনানিতে নিয়োগ দেওয়া হয় অ্যামিকাসকিউরিদের। ৯ জন অ্যামিকাসকিউরি তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে মত দেন। কিন্তু দেশের শীর্ষ আইনজ্ঞদের মতকে উপেক্ষা করে ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয় আপিল বিভাগ।


সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এ রায় দেয়। রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়ার পক্ষে মত দেয়। অবসরের ১৬ মাস পর গিয়ে বিচারপতি খায়রুল হক ২০১২ সালে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে বদলে ফেলেন সংক্ষিপ্ত আদেশ। রায় প্রকাশের আগেই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করে। যার মধ্যদিয়ে বাতিল হয়ে যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি। যে পদ্ধতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে ১৭৬ দিন হরতাল করেছিল আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর দলীয় আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেসব নির্বাচনগুলোর স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।


মামলার আপিল শুনানিতে রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম আসাদুজ্জামান আপিল বিভাগে বলেছিলেন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছিল বিচারপতি খায়রুল হক। এই সরকারব্যবস্থা বাতিলের ফলে গত দেড় দশকে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। প্রায় ৭০ লাখের মতো মানুষ মিথ্যা গায়েবি মামলার আসামি হয়েছেন। এই অবস্থা থেকে দেশের জনগণ মুক্তি চায়।


ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে গত বছরের ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে ফেরাতে ওই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ পিটিশন করেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। গত ২৭ আগস্ট বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তির করা পৃথক পৃথক রিভিউ পিটিশন মঞ্জুর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসংক্রান্ত রায়ের বিরুদ্ধে পুনরায় আপিল শুনানির অনুমতি দেয় আপিল বিভাগ। ঐ আপিলের শুনানি শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালে রায় দেয় দেশের সর্বোচ্চ আদালত।


রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে যা বলা হয়েছে:
আপিল বিভাগ বলেছে, আপিলসমূহ সর্বসম্মতভাবে মঞ্জুর করা হলো। সিভিল রিভিউসমূহ সেই আলোকে নিষ্পত্তি করা হলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে আপিল বিভাগ অতীতে যে রায় দিয়েছিল সেটা বাতিল করা হলো। ফলশ্রুতিতে, সংবিধানের চতুর্থ ভাগের পরিচ্ছেদ ২ক-এর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত বিধানাবলি, যা সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬ (১৯৯৬ সনের ১ নং আইন) এর ধারা ৩ দ্বারা সন্নিবেশিত হয়েছিল, তা এতদ্বারা এই রায়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো। যদিও এইরূপ পুনরুজ্জীবন পরিচ্ছেদ ২ক-এ বর্ণিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিধানাবলির স্বয়ংক্রিয় পুনঃস্থাপন নিশ্চিত করে, তবে পুনরুজ্জীবিত অনুচ্ছেদ ৫৮খ (১) এবং অনুচ্ছেদ ৫৮গ (২)-এর বিধানাবলির প্রয়োগ সাপেক্ষে উহা কার্যকর হবে। পুনঃস্থাপিত ও পুনরুজ্জীবিত পরিচ্ছেদ ২ক-এ বর্ণিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধানাবলি কেবল উক্তরূপ ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতেই কার্যকর হবে। পূর্ণাঙ্গ রায় পরবর্তী  সময়ে প্রদান করা হবে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)