ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহে বিষাক্ত স্পিরিট (অ্যালকোহল) পানে নিহতদের মধ্যে চারজনের গোপনে দাফন সম্পন্ন করে পরিবারের সদস্যরা। গত শনিবার দুজন ও রোববার দুজনসহ এই চারজন বাড়িতে অবস্থানকালে মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়াও গত রোববার সন্ধ্যার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অস্থায় লাল্টু মিয়া ও হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিলে সমির শেখ মারা যান। গতকাল সোমবার বেলা তিনটায় ময়নাতদন্ত শেষে তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। বিকেলে গ্রাম্য কবরস্থানে পরিবারের সদস্যরা তাদের দাফনকার্য সম্পন্ন করে। এদিকে, বিষাক্ত অ্যালকোহল পানে মৃত্যু হয়েছে সন্দেহে হায়াত আলী (৫৫) নামের অপর এক কৃষি শ্রমিকের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে।
শংকরচন্দ্র ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য দুলু মিয়া জানান, বেলা তিনটার পর লাল্টু মিয়া ও সমির শেখের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষ হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাদেরকে নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে যায়। আছর নামাজের পর লাল্টু মিয়াকে শংকরচন্দ্র দেন্দ্রীয় কবরস্থানে ও সমির শেখকে ডিঙ্গেদহ মানিকডিহি গ্রাম্য কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। একে একে ছয়টি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়ায় গ্রামজুড়ে শোক নেমে এসেছে।
এদিকে, অ্যালকোহল পানে মৃত্যু হয়েছে সন্দেহে কৃষি শ্রমিক হায়াত আলীর মরদেহ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ। গতকাল সোমবার বেলা তিনটার দিকে নিজ বাড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতাল মর্গে নেয়া হয়। নিহত হায়াত আলী সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের কাথুলী গ্রামের বাজারপাড়ার মৃত রসূল মণ্ডলের ছেলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত দুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন হায়াত আলী। সকালে তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় গতকাল সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
হায়াত আলীর প্রতিবেশী লিপন আলী বলেন, ‘সকাল ১০টার দিকে খবর পাই হায়াত চাচা মারা গেছেন। তিনি দুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পরিবারের সদস্যরা তাকে চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে সাতগাড়ী পৌঁছালে পরিবারের সদস্যরা দেখেন হায়াত চাচা নিঃশ্বাস নিচ্ছেন না। এসময় সাতগাড়ী মোড়ের এক চিকিৎসকের কাছে নিলে জানা যায় তিনি মারা গেছেন। এসময় হায়াত চাচার মৃতদেহ বাড়িতে নেয়া হয়।’
লিপন আরও বলেন, ‘ডিঙ্গেদহে বিষাক্ত অ্যালকোহল পানে ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনার কারণে গ্রামের অনেকে সন্দেহ করেন হায়াত চাচাও বিষাক্ত অ্যালকোহল পান করে থাকতে পারেন। খবর পেয়ে পুলিশ দুপুরে বাড়ি থেকে হায়াত চাচার মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে মর্গে পাঠায়। বিকেল পাঁচটার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ।
অন্যদিকে, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুজনের মধ্যে আলিম উদ্দীনের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সোমবার সকালেই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। তবে সকাল আটটার দিকে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে যায়।
আলিম উদ্দীনের স্ত্রী জহুরা বেগম বলেন, ‘সকাল আটটার দিকে হাসপতালের ডাক্তার আমার স্বামীকে দেখেন। এসময় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী নিয়ে যেতে বলেন এবং ছুটি দিয়ে দেন। আমরা সকালেই তাকে বাড়িতে নিয়ে এসছি। টাকার জোগাড় হলে আজকালের মধ্যে রাজশাহী নিয়ে যাবো।’ হাসপাতালে এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন অ্যালকোহল পানে অসুস্থ অপর ব্যক্তি শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের মানিকদিহি গ্রামের আমজাদ হোসেনের ছেলে রাশিদুল ইসলাম। তার অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, ‘দুপুরে খবর পাই কাথুলী গ্রামে অপর এক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন। গ্রামবাসীর মধ্যে এই মৃত্যু নিয়ে গুঞ্জন ছিল, তিনিও অ্যালকোহল পান করে থাকতে পারেন, যে কারণে তারও মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করা হয়। এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অ্যালকোহল পানে দুই দিনে ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল থানায় একটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এই ঘটনার বিষয়ে আরও পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে আমাদের অভিযান অব্যহত রয়েছে। আমরা ঘটনাটির শেকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে চাই।’ তিনি আরও জানান, কাথুলী গ্রামের হায়াত আলীর মৃত্যুর ঘটনায় থানায় পৃথক অপমৃত্যু মামলা রুজু করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় বিষাক্ত স্পিরিট পানে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আরও তিনজন দিনমজুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিহতদের সবাই নিম্নআয়ের দিনমজুর এবং নিকটস্থ পাশাপাশি গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহ বাজার এলাকায় ৯ জনের অধিক দিনমজুর একসাথে অ্যালকোহল পান করেন। এরপর দুই দিনে একে একে পাঁচজন মারা গেলেও অ্যালকোহল পানের বিষয়টি সামনে আসেনি। গত রোববার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যুর পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
