ছবির ক্যাপশন:
বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘পাল্টা শুল্ক’ আরও কমছে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পৃথক যুগোপযোগী বাণিজ্য চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। পাল্টা শুল্ক অন্তত ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং সেই ভিত্তিতে চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এ হার ২০ শতাংশে কার্যকর করলেও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি। আগামীকাল রোববার বাণিজ্য ইস্যুতে তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি প্রতিনিধি দল। মার্কিন সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডেন লিঞ্চের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ‘পাল্টা শুল্ক’ নিয়ে আরেক দফা আলোচনা করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে এর আগের সমঝোতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা করবেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জানা গেছে, দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক ও বেসামরিক পণ্য, জ্বালানি, কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্য আমদানি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে পোশাকের পাশাপাশি, প্লাস্টিক পণ্য ও হস্তজাত শিল্পপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দু’দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা এবং রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দল (ইউএসটিআর) ইতোমধ্যে চুক্তির খসড়া প্রণয়ন করছে, যা নিয়ে এবারের বৈঠকে আলোচনা করা হবে। বাংলাদেশ মতামত দেওয়ার পর তা চূড়ান্ত করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক সই হবে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে গত মাসে। এর আগে গত জানুয়ারি থেকে জুলাই (সাত মাসে) এই বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই হার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ পাঁচ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ থেকে ৪৯৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। শুধু জুলাইয়ে রপ্তানি হয়েছে ৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, ভারত ও চীনের হারানো ক্রয়াদেশের একটা অংশ বাংলাদেশে আসছে। ছয় থেকে আট মাস ধরে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। পাল্টা শুল্কের কারণে সামনের মৌসুম থেকে আরও বাড়তি ক্রয়াদেশ আসতে পারে। যদিও কোনো কোনো ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাড়তি শুল্কের একটি অংশ বহন করতে রপ্তানিকারকদের চাপ দিচ্ছে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য চুক্তি করা হলে পাল্টা শুল্ক কমানোর পাশাপাশি দেশটিতে রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বাংলাদেশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকা সফরে আসছে সহকারী ইউএসটিআর ব্রেন্ডেন লিঞ্চের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল। তিনি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বাণিজ্য নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুল্ক আরও কিছুটা কমানোর প্রস্তাব করা হবে। আলোচনায় উভয় পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।
এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি প্রতিনিধি দলটির অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে তাদের। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ এবং পরে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল। ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফা আলোচনার পর গত ৩১ জুলাই তা ২০ শতাংশে নামানো হয়। তবে এর জন্য বাংলাদেশকে কিছু ছাড় দিতে হয়। সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ৬০০ কোটি ডলার থেকে কমাতে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেড় বিলিয়ন বা ১৫০ কোটি ডলার আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। এসব ছাড়ের ভিত্তিতে সরকার আশা করছে পাল্টা শুল্ক অন্তত ১৫ শতাংশ বা তারও কমে নামানো সম্ভব হবে।
এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকার বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনবে, যাতে খরচ হবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি পাঁচ বছর মেয়াদে প্রতি বছর সাত লাখ টন গম আমদানি করা হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম, বেসামরিক উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ, জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, তুলা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি বাড়ানো হবে। কিছু খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা তুলে নেওয়া হবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সহজ করা হবে। বিদেশি মূলধন প্রবাহ সহজ ও স্বচ্ছ করতে নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মেধাসম্পদ, আমদানি, সেবা খাত, পরিবেশ ও শ্রম অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে ছাড় দিচ্ছে। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) যে অনুমোদন দেবে, তা বাংলাদেশ মেনে নেবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের দুগ্ধ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মাংস ও পোলট্রি, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও ডিমজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে স্বীকৃতি এবং দেশটির গরু, ভেড়া বা ছাগলের দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির অনুমতি দেবে বাংলাদেশ। বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বৈশ্বিক রপ্তানির ১৭ থেকে ১৮ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। আর্থিক পরিমাণে যা প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার।
ইউএসটিআর এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৬০ কোটি ডলার। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানির বিপরিতে ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আমদানি নীতি পরিবর্তন করে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার তুলে নেওয়া ছাড়াও বন্দর ব্যবস্থাপনাসহ অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা নিয়ে আশাবাদী অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এখনো অনেক দেশের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট এক্ষেত্রে বড় একটা স্টেকহোল্ডার। তারা যখন এটি মূল্যায়ন করবে তখন কেবল বাণিজ্যিক বিষয়গুলোই গুরুত্ব পাবে তা নয়, তাদের চিন্তায় ভূ-রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির বিষয়গুলোও থাকবে। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও মনে করেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিও এক্ষেত্রে গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ পর্যন্ত ট্যারিফ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েকটি দেশের ডিল (চুক্তি) হয়েছে। কারণ সব দেশই জিও-পলিটিকাল বিষয় মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। শুল্ক আরও কমার ব্যাপারে আশাবাদী ব্যবসায়ী নেতারাও। তবে তারা এটাও বলছেন, আলোচনার মাধ্যমে বাড়তি শুল্ক কমে না আসলে দেশের রপ্তানিকারকরা বিপদে পড়বেন; বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল। এ কারণে আলোচনা বা যেকোনো বাণিজ্য চুক্তি করার মাধ্যমে পাল্টা শুল্ক আরও কমিয়ে আনতে হবে।
