জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটসহ চার বিকল্প পথ

আপলোড তারিখঃ 2025-09-12 ইং
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটসহ চার বিকল্প পথ ছবির ক্যাপশন:

গণভোট, বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ, অধ্যাদেশ ও নিবাহী আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদ (যার মধ্যে ভিন্নমত/নোট অব ডিসেন্ট আছে) বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গতকাল বৃহস্পতিবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে কমিশনের পক্ষ থেকে এমন সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, জুলাই সনদের সংবিধানের বিষয়গুলো বাস্তবায়নে দলগুলো বিভিন্ন প্রস্তাব দেয়। সেগুলোর মধ্যে- পূর্ণাঙ্গ সনদ বা তার কিছু অংশ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠান; রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা বলে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশে বাস্তবায়ন করা; নির্বাচনের মধ্যে একটি গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ব্যবস্থা করা; এয়োদশ সংসদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এ সনদ বাস্তবায়ন; সংসদকে সংবিধান সংস্কার সভারূপে প্রতিষ্ঠিত করে সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের কাছে এ মর্মে মতামত চাওয়া যে, অন্তর্বর্তী সরকার এ সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না।


দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ঐকমত্য কমিশন বিশেষজ্ঞ প্যানেল একাধিক বৈঠকে বিভিন্ন ধরণের বিকল্প বিবেচনা করে প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচ পদ্ধতিতে জন্য বাস্তবায়নের সুপারিশ করে এগুলো হচ্ছে-অধ্যাদেশ, নির্বাহী আদেশ, গণভোট, বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ এবং ১০৬ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাওয়া। পরে আরো বিস্তারিত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ অন্তর্ভুক্ত হওয়া বিষয়গুলোকে (যার মধ্যে ভিন্নমত/নোট অব ডিসেন্ট আছে) চারভাবে বাস্তবায়নের জন্য পরামর্শ দিয়েছে। সেগুলো অধ্যাদেশ, নির্বাহী আদেশ, গণভোট এবং বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ। এর আগে গত বুধবার সংসদ ভবনে ঐকমত্য কমিশন কার্যালয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে পাঠানো বার্তায় বলা হয়, বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের দেওয়া বাস্তবায়ন সংক্রান্ত মতামত পুনরায় পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে সনদটি জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন এবং একটানা আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত ঐকমত্যের ফল হিসেবে তা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে আরো বলা হয়, জনগণই রাষ্ট্রের মালিক এবং জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ আইন। গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাই রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ ২০২৫-কে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে মেনে নিয়েছে। তারা সনদটিকে সংবিধানে সংযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকারদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া মতামত বিশ্লেষণ করে তা সনদে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, এটি হলো নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যা জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাথকে নিয়েছে। জন্ম সেই সময় হাজারো মানুষ জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ এবং ত্যাগস্বীকার সীমাহীন শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান, শহীদ পরিবারকে সহায়তা এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।


উচ্চকক্ষ গঠনের সিদ্ধান্ত জানাল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন:
রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের রূপরেখাও সনদে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধান, বিচার-ব্যবস্থা, নির্বাচন-ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন-ব্যবস্থা সংস্কারে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধন, আইন পরিবর্তন ও নতুন আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, সনদের যে সিদ্ধান্তগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো বিলম্ব না করে দ্রুত বাস্তবায়ন করবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জুলাই জাতীয় সনদে যেসব সংস্কার ও পরিবর্তনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ভাষা ও পরিচয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা থাকবে, তবে সংবিধানে মাতৃভাষা ব্যবহারের স্বীকৃতি পাবে। নাগরিকদের পরিচয়ে ‘বাংলাদেশি’ শব্দ ব্যবহৃত হবে। যেটা বর্তমান সংবিধানে বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি হিসেবে পরিচিত।


সংবিধান সংশোধন ও সংবিধানের বাস্তবায়নে গণভোটসহ ৪ বিকল্প সুপারিশ:
গুরুত্বপূর্ণ ধারা পরিবর্তনে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যদের সমর্থন লাগবে। সংবিধানের ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং নতুন করে যুক্ত হতে যাওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থার বিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশের ভোটের পাশাপাশি গণভোট বাধ্যতামূলক করা হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হবে- গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।


রাষ্ট্রপতি নির্বাচন:
সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য নিজ ক্ষমতাবলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। তবে এ বিষয়ে বিএনপিসহ ৮ দল আপত্তি তুলেছে।


প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ:
এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই এবং মোট ১০ বছর প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকতে পারবেন। জরুরি অবস্থা জারির নতুন নীতিমালা জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, আগের মতো ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’কে আর জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে ধরা হবে না। এর পরিবর্তে নতুন ধারায় কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতার প্রতি হুমকি, সশস্ত্র বিদ্রোহ বা সশস্ত্র আগ্রাসন- এ জাতীয় পরিস্থিতিতেই জরুরি অবস্থা জারি করা যাবে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জরুরি অবস্থা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের বিধান যুক্ত করা হবে। মন্ত্রিসভার সেই বৈঠকে বিরোধী দলের নেতা অথবা তার অনুপস্থিতিতে বিরোধী দলীয় উপনেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। জরুরি অবস্থা চলাকালেও নাগরিকদের দুটি মৌলিক অধিকার স্থগিত করা যাবে না। এগুলো হলো জীবনের অধিকার এবং ন্যায়বিচার ও দণ্ডসংক্রান্ত অধিকার, যা সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত।


উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা আগে প্রকাশ ও ১০ শতাংশ নারী ঐক্যমত কমিশন প্রস্তাবে বলেছে, বাংলাদেশে একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে। যার নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট) ১০০ (একশত) সদস্য দ্বারা গঠিত হবে। নিম্নকক্ষের ভোটের সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। রাজনৈতিক দলগুলো নিম্নকক্ষের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময় উচ্চকক্ষের প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। সেখানে ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী থাকতে হবে। তবে উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকবে না, কিন্তু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আইন প্রণয়নে নিম্নকক্ষকে প্রস্তাব দিতে পারবে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন ও দলের বিরুদ্ধে ভোট প্রধানের সুযোগ কমিশনের প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বর্তমান বিধান সংশোধন করে সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে শুধু অর্থবিল এবং আস্থা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকবে। অন্য যেকোনো বিলে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। গত বছর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথমে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। পরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই কমিশনগুলোর প্রধানদের সমন্বয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ ও ঐকমত্যের মাধ্যমে জুলাই সনদ প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় এ কমিশনকে। চলতি বছরের মার্চে প্রথম দফায় ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠকে ১৬৬টি প্রস্তাব আলোচনায় আসে। এর মধ্যে ৬২টিতে ঐকমত্য হয়। দ্বিতীয় দফায় আরো ২০টি বিষয়ে সম্মতি হয়। তবে, বিএনপি, জামায়াত, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি ও কয়েকটি দল ৯টি বিষয়ে ভিন্নমত জানায়। এসবের ভিত্তিতে ৮৪ দফা প্রস্তাব নিয়ে ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রাথমিক খসড়া পাঠানো হয়। যদিও চূড়ান্ত খসড়ায় ৮৪টি প্রস্তাব রয়েছে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)