ছবির ক্যাপশন:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচনে বিভিন্ন হল ও কেন্দ্রীয় সংসদে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীরা অধিকাংশ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ডাকসুর ২৮ পদের মধ্যে ২৩ টিতেই জয়লাভ করেছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। ফলাফল শেষে পরাজিত প্রার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের আপত্তি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তা নিয়ে কোনো উত্তেজনা দেখা যায়নি ক্যাম্পাসে। ফলাফল ঘোষণার পর ভিপি পদে বিজয়ী সাদিক কায়েম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আবাসন, গবেষণাসহ সব বিষয় নিয়ে কাজ করা হবে। শিক্ষার্থীদের আকাক্সক্ষাই আমাদের আকাক্সক্ষা।’ ভিপি পদে পরাজিত ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমার নির্বাচনী ইশতেহারে যা কিছু ছিল, তা একজন ছাত্রনেতা হিসেবেই প্রশাসনের কাছ থেকে আদায় করে নিতে যা যা করা দরকার, তা আমি করব।’
এর আগে গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ। ভোটগ্রহণ শেষেই শুরু হয় গণনার কাজ। সব কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আনুষ্ঠানিক ফলাফ ল ঘোষণা করা হয়। ফলাফল ঘোষণা করেন ডাকসুর চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।
বিজয়ী যারা:
ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) পদে ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়ে জিতেছেন শিবিরের প্রার্থী মো. আবু সাদিক কায়েম। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৫ হাজার ৭০৮ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীম হোসেন ৩ হাজার ৮৮৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। ৩ হাজার ৩৮৯ ভোট পেয়ে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের উমামা ফাতেমা হয়েছেন চতুর্থ। আর বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের প্রার্থী আবদুল কাদের পঞ্চম হয়েছেন ১ হাজার ১০৩ ভোট পেয়ে। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে শিবিরের প্রার্থী এস এম ফরহাদ ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়ে জিতেছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের শেখ তানভীর বারী হামিম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮৩ ভোট। ৪ হাজার ৯৪৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন বামপন্থী সাতটি ছাত্রসংগঠনের যৌথ প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’র প্রার্থী মেঘমল্লার বসু। স্বতন্ত্র প্রার্থী আরাফাত চৌধুরী ৪ হাজার ৪৪ ভোট পেয়ে চতুর্থ হয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের প্রার্থী আবু বাকের মজুমদার ২ হাজার ১৩১ ভোট পেয়ে হয়েছেন পঞ্চম।
এজিএস পদে শিবিরের প্রার্থী মুহা. মহিউদ্দীন খান ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের তানভীর আল হাদি মায়েদ পেয়েছেন ৫ হাজার ৬৪ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী (গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের নেতা) তাহমীদ আল মুদ্দাসসীর চৌধুরী ৩ হাজার ৮ ভোট পেয়ে আছেন তৃতীয় অবস্থানে। ১ হাজার ৫১১ ভোট পেয়ে চতুর্থ হয়েছেন প্রতিরোধ পর্ষদের জাবির আহমেদ জুবেল। আর ১ হাজার ১৩৭ ভোট পেয়ে পঞ্চম হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনি। ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে ৯টিতে জিতেছে শিবিরের প্যানেল। বাকি তিনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। তারা হলেন গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে সানজিদা আহমেদ তন্বি, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ এবং সমাজসেবা সম্পাদক পদে যুবাইর বিন নেছারী।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে শিবিরের প্যানেলের প্রার্থী ফাতেমা তাসনিম জুমা ১০ হাজার ৬৩১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আরিফুল ইসলাম পেয়েছেন ২ হাজার ৪৭০ ভোট। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে শিবিরের প্যানেলের ইকবাল হায়দার ৭ হাজার ৮৩৩ ভোট পেয়ে জিতেছেন। ৪ হাজার ২৭৩ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের আহাদ বিন ইসলাম শোয়েব। কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ৯ হাজার ৯২০ ভোট পেয়ে শিবিরের প্যানেলের প্রার্থী উম্মে ছালমা জয়ী হয়েছেন। ৪ হাজার ৪৮২ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের সুর্মী চাকমা। আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে শিবিরের প্যানেলের জসীমউদ্দিন খান ৯ হাজার ৭০৬ ভোট পেয়ে জিতেছেন। ৩ হাজার ৯২২ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের মোহাম্মদ সাকিব। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ৭ হাজার ৭৮২ ভোট পেয়ে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। ২ হাজার ৭৪৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন শিবিরের প্রার্থী নুরুল ইসলাম।
গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সানজিদা আহমেদ তন্বি। তার প্রাপ্ত ভোট ১১ হাজার ৭৭৮। তাকে সমর্থন জানিয়ে ছাত্রদলসহ কয়েকটি প্যানেল এই পদে প্রার্থী দেয়নি। এপদে শিবিরের প্রার্থী মো. সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন ৭ হাজার ১৮৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। ক্রীড়া সম্পাদক পদে শিবিরের প্রার্থী আরমান হোসেন ৭ হাজার ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। ৩ হাজার ৮৩১ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের প্রার্থী মো. আল-আমিন সরকার। ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ৯ হাজার ৬১ ভোট পেয়ে জিতেছেন শিবিরের প্রার্থী আসিফ আবদুল্লাহ। ৪ হাজার ৫০৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের রাফিজ খান।
সমাজসেবা সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবাইর বিন নেছারী (এবি জুবায়ের) ৭ হাজার ৬০৮ ভোট পেয়ে জিতেছেন। ছাত্রদলের প্রার্থী সৈয়দ ইমাম হাসান অনিক ৩ হাজার ৯০৩ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। ৯ হাজার ৩৪৪ ভোট পেয়ে ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক পদে জিতেছেন শিবিরের প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম। ৪ হাজার ১২৩ ভোট পেয়ে এই পদে দ্বিতীয় হয়েছেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যে’র রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ৭ হাজার ৩৮ ভোট পেয়ে জিতেছেন শিবিরের প্রার্থী এম এম আল মিনহাজ। স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহরিয়ার মোহাম্মদ ইয়ামিন ২ হাজার ৯৬৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। মানবাধিকার ও আইন সম্পাদক পদে শিবিরের প্রার্থী মো. জাকারিয়া ১১ হাজার ৭৪৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের আনিকা তাহসিনা ৩ হাজার ৪২৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। এছাড়া ডাকসুর ১৩টি সদস্যপদের মধ্যে ১১টিতেই জিতেছেন শিবিরের ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা। তারা হলেন- সাবিকুন নাহার তামান্না (১০ হাজার ৮৪ ভোট), সর্ব মিত্র চাকমা (৮ হাজার ৯৮৮ ভোট), ইমরান হোসাইন (৬ হাজার ২৫৬ ভোট), মোছা. আফসানা আক্তার (৫ হাজার ৭৪৭ ভোট), তাজিনুর রহমান (৫ হাজার ৬৯০ ভোট), রায়হান উদ্দীন (৫ হাজার ৮২ ভোট), মো. মিফতাহুল হোসাইন আল-মারুফ (৫ হাজার ১৫ ভোট), আনাস ইবনে মুনির (৫ হাজার ১৫ ভোট), মো. বেলাল হোসেন অপু (৪ হাজার ৮৬৫ ভোট), মো. রাইসুল ইসলাম (৪ হাজার ৫৩৫ ভোট) ও মো. শাহিনুর রহমান (৪ হাজার ৩৯০ ভোট)। এ ছাড়া বামপন্থীদের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ থেকে সদস্যপদে ৪ হাজার ৯০৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন হেমা চাকমা। ৪ হাজার ২০৯ ভোট পেয়ে সদস্যপদে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী উম্মা উসওয়াতুন রাফিয়া।
বিজয় উদযাপনে দু’দিনের কর্মসূচি শিবিরের:
ডাকসুতে বিজয় উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। গত মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শুকরিয়া আদায় করে দোয়া মাহফিল ও শব্বেদারি (নৈশ ইবাদত) বাস্তবায়ন; শহীদদের কবর জিয়ারত এবং শহীদ পরিবার ও আহতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ। পাশাপাশি কোনও ধরনের আনন্দ মিছিল বা শোভাযাত্রা আয়োজন না করার জন্যও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আইন উপদেষ্টার অভিনন্দন:
ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী ছাত্র শিবিরের প্যানেলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। এছাড়াও বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ফলাফল মেনে নেওয়া অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদেরও তিনি শুভেচ্ছা জানান। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে আইন উপদেষ্টা লেখেন, ‘ডাকসুতে শিবিরের বিশাল বিজয় নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। আমি শুধু একটা কথা বলব- এই নির্বাচনের মাধ্যমে ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতির ভূমিধস পরাজয় হয়েছে। হাসিনার আমলে শিবির ট্যাগ নিয়ে অগণিত শিবির কর্মী ও সাধারণ ছাত্রদের প্রতি অমানুষিক নির্যাতন হয়েছে। শিবির সন্দেহে পেটানোর পর পুলিশে সোপর্দের ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। তিনি লেখেন, আমি অবিরামভাবে এর তীব্র প্রতিবাদ করেছি। নানা হুমকি ও আক্রমণ এসেছে, কখনও থামিনি। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই থিমের ওপর ‘আমি আবুবকর’ নামের উপন্যাসও লিখেছি। শিবিরের নেতাদের প্রতি আমার অনুরোধ গণঅভ্যুত্থানকারী সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করুন।’
