ছবির ক্যাপশন:
আদালত কর্তৃক ঘোষিত ফেরারি আসামি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন, এমন বিধান আইনে যুক্ত করার প্রস্তাবনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বা সদস্য হিসেবে থাকলে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যাবে না। এ ধরনের বেশ কিছু প্রস্তাবনা সংযোজন করে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) খসড়া চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত মঙ্গলবার এই নতুন প্রস্তাবনা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। গতকাল বুধবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, ‘কোনো দলের কার্যক্রম স্থগিত থাকলে তাদের প্রতীকও স্থগিত থাকবে। তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।’ কিন্তু প্রতীক ছাড়া স্বতন্ত্র দাঁড়াতে পারবে কি না সেটা সময় বলে দেবে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার না হলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসির নিবন্ধিত এ দলটি দলীয় প্রতীক নিয়ে অংশ নিতে পারবে না। আওয়ামী লীগের নাম না নিলেও স্থগিত থাকার দলের বিষয়ে ইসির অবস্থান স্পষ্ট করলেন ইসি সানাউল্লাহ। সংশোধিত আরপিওর খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আদালত কর্তৃক ফেরারি ঘোষিত ব্যক্তিরাও সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। ফেরারি আসামিদের নির্বাচনে অযোগ্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমসাময়িক বাস্তবতায় আমাদের কাছে মনে হয়েছে এটা যৌক্তিক। যদি ভবিষ্যতে দেখা যায় যে, এটার অপব্যবহার হচ্ছে। তখন আমাদের আবার রিভিউ করতে হবে। ‘না ভোটের’ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথম বার একক প্রার্থী থাকলে ‘না ভোটের’ সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। এতে ‘না ভোট’ বিজয়ী হলে পুনরায় নতুন তপশিল করে ভোট হবে। তবে দ্বিতীয় বার অন্য কোনো প্রার্থী না থাকলে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। লটারি প্রথা বাতিল করে সমভোট পড়লে পুনরায় ভোটের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী :
সংশোধিত খসড়া আরপিওতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর ফলে সেনাবাহিনীও অন্যান্য প্রচলিত বাহিনীর মতো যেমন পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী অন্তর্ভুক্ত থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর তাদের প্রথম মেয়াদে তা বাদ দেয়। ফলে গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) সেনাবাহিনী কেবল স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে এমপি পদ বাদ :
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সর্বশেষ বছরের ইনকাম ট্যাক্সের রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আয়ের বিবরণী, দেশ ও বিদেশে সম্ভাব্য আয়ের উৎস, নিজস্ব এবং নির্ভরশীল সদস্যদের দেশি-বিদেশি সম্পত্তির বিবরণ জমা দিতে হবে। প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণ কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে সংসদ সদস্যের মেয়াদের পাঁচ বছরের মধ্যে তা প্রমাণিত হলে সংসদ সদস্যপদ বাতিল করতে পারবে কমিশন।
পুরো আসনের ভোট বন্ধ করতে পারবে ইসি :
পুরো আসনের ভোট বন্ধ করার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে জানিয়ে সানাউল্লাহ বলেন, প্রিজাইডিং অফিসারকে ক্ষমতায়িত করার পাশাপাশি জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে। তিনি আরো জানান, ভোটকেন্দ্রের তালিকা করার দায়িত্ব মাঝখানে ইসির কাছে ছিল না। তালিকা এখন থেকে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তৈরি করবেন এবং কমিশন কর্তৃক এটা অনুমোদিত হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এআই ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, এআইয়ের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আচরণবিধি ভঙ্গ হয়, এমন কিছু করা যাবে না। প্রার্থীরা বা দল যেসব প্ল্যাটফরম ব্যবহার করবে তার তালিকা এবং লিংকের বিস্তারিত আগেই জানাতে হবে।
আওয়ামী লীগ স্বতন্ত্র ভোট করতে পারবে কি না, সময় বলে দেবে :
ইসি সানাউল্লাহ বলেন, যদি কোনো কারণে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের ওপরে সরকার কোনো স্থগিত আদেশ দেয়, সেই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং প্রতীক স্থগিত থাকবে। নিষিদ্ধ দলের পদধারীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটি সময়ই বলে দেবে। সুষ্ঠু ভোট হয়েছে, এই বিষয়ে সার্টিফাই করার বিষয়ে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ছিল। এছাড়া কমিশনের বিভিন্ন জবাবদিহিতার বিষয়েও সুপারিশ ছিল। সাংবাদিকেরা সেগুলো নজরে আনলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশই সার্টিফিকেশন যে নির্বাচন কমিশন এটার দায়িত্ব নিয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মীরা ভোট গণনার সময় থাকতে পারবেন :
গণমাধ্যমকর্মীরা ভোট গণনার সময় থাকতে পারবেন। তবে শর্ত যে, ভোট গণনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকতে হবে। অনেক সময় প্রিজাইডিং অফিসার নিজেই অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। ইসির দেওয়া কার্ড থাকা সত্ত্বেও সেই প্রিজাইডিং অফিসারকে সাংবাদিকদের অবহিত করার বিষয়টি নজরে আনলে তিনি বলেন, আপনারা যেই নির্বাচনের কথা বলছেন- সেই নির্বাচনে সম্ভবত ভোটারও ছিল না। যে ভোটার লাইন আমরা দেখেছি, সেই ভোটার লাইনটাও সঠিক ছিল না। সেই নির্বাচনে সম্ভবত ভোটকেন্দ্রের ভেতরে এজেন্টও ছিল না। অনুরূপভাবে যথাযথ সাংবাদিকদের উপস্থিতি ছিল না, পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি ছিল না। ইনশাআল্লাহ সেই নির্বাচন বাংলাদেশে আর হবে না।
ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ খরচ ১০ টাকা :
প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনি ব্যয় ছিল ২৫ লাখ টাকা। পরিপত্রের মাধ্যমে বলা হতো যে ভোটার প্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় করা যাবে। এই হিসেবে কোনো আসনে ১ লাখ ভোটার থাকলে তিনি সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা খরচ করতে পারতেন। আরপিওর এই অংশে সংশোধন আনা হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট আসনে কম ভোটার থাকলে যেমন ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করা যাবে। তেমনি ভোটার যতই হোক ভোটার প্রতি ১০ টাকা হারে ব্যয় করা যাবে বলেও জানান তিনি। তিনি আরও জানান, ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে যে কোনো রাজনৈতিক দল ১০ লাখ এবং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান নিতে পারত। এই দুটোকেই ৫০ লাখ করা হয়েছে। ৫০ হাজারের ওপরে অনুদান ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে হতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ট্যাক্স রিটার্নেও দেখাতে হবে। এছাড়া খসড়া সংশোধনীতে প্রার্থীর নির্বাচনি জামানত ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
জোটসঙ্গীদের নিজ দলের প্রতীক ব্যবহার বাধ্যতামূলক :
জোট সমর্থিত প্রার্থীদের নিজ দলের প্রতীক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রার্থীর নির্বাচনি এজেন্ট সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ভোটার হতে হবে। ইভিএম সংক্রান্ত সব প্রভিশন বিলুপ্ত করা হয়েছে। পোস্টাল ব্যালট যুক্ত করা হয়েছে। পোস্টার বাতিল করা হয়েছে। অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিধান বাতিল করা হয়েছে।
