হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে মুক্ত পরিবেশ ফিরে পায় রাজনৈতিক দলগুলো। একইসঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে তাদের ছাত্র সংগঠন। এর মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও দেখা দেয় নতুন করে সক্রিয় হওয়া ছাত্র সংগঠনগুলোর আধিপত্য। এ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও মুখোমুখি অবস্থানও নিচ্ছে তারা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্ররাজনীতিতে এ আধিপত্য আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের ছাত্র সংগঠন- ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবির। সম্প্রতি ঢাকসু ও রাকসু নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে শিবির, আবার কোথাও ছাত্রদল-শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে অন্যান্য ছাত্রসংগঠনগুলো। এমন পরিস্থিতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে। যেন একে-অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে তারা।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসগুলোতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে ছাত্রদল ও শিবির। যার ফলে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম চালাতে গিয়েও বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এর মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসগুলোতে প্রচারণায় অন্যান্য ছাত্র-সংগঠনগুলো আচরণবিধি কিছুটা মানলেও বরাবরই তা উপেক্ষা করছে বড় দুই দল বিএনপি এবং জামায়াতের ছাত্র সংগঠন। যদিও আচরণবিধি না মানা নিয়ে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধেও কিছু অভিযোগ রয়েছে। অতিসম্প্রতি ডাকসু নির্বাচনের নারী প্রার্থীকে ‘গণধর্ষণের’ হুমকি দেন আলী হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী। আলী হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। আর হুমকির শিকার ওই নারী শিক্ষার্থী ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদের প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করা রিট আবেদনকারী।
তবে গণধর্ষণের হুমকিদাতাকে ‘শিবির নেতা’ বলে দাবি করেছে ছাত্রদল। প্রতিবাদ জানিয়ে কর্মসূচিও ঘোষণা করে। ঘোষিত কর্মসূচি হিসেবে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পায়রা চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এরপর সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে সংগঠনটি। এ সময় ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল নেত্রীদের হেনস্তা ও নারী শিক্ষার্থীদের সাইবার বুলিংয়েরও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, ‘নারী নিপীড়নমূলক কথাবার্তা ৫ আগস্টের পর থেকে চলে আসছে। কিন্তু প্রশাসন আজ পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যার কারণে আজকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে গণধর্ষণের পদযাত্রার হুমকির মতো ঘটনা দেখতে হচ্ছে।’
সমাবেশে ডাকসু নির্বাচনের ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান বলেন, ‘৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমাদের বোনদের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অনলাইনে প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি নারী হেনস্তাকারীদের যখন জেল থেকে ছাড়ানো হলো, তখন একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তাদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছে, যা একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। এরই ফলশ্রুতিতে আলী হুসেন নামের এক শিক্ষার্থী তার মেয়ে সহপাঠীকে গণধর্ষণের পদযাত্রার হুমকি দিয়েছে। অথচ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং ঢাবি প্রশাসন তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদপ্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম চারটি বিষয় তুলে ধরে বলেন, ‘নারী হেনস্তাকারীদের থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা, শিক্ষার্থীদের ভোট গ্রহণে কার্ড ব্যবস্থার জটিলতা, ডাকসু নির্বাচনের জন্য সেনা মোতায়েন ও সর্বশেষ নির্বাচনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির ব্যবস্থা- এসব ঘটনা ঘটেছে ডাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করার জন্য।’
এদিকে শিবিরকে জড়িয়ে ছাত্রদল অপপ্রচার চালিয়ে ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করছে বলে অভিযোগ তুলেছে সংগঠনটি। অভিযোগের বিষয়ে সংগঠনটি বলেছে, ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদের প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে রিটকারী ছাত্রীকে ‘গণধর্ষণের’ হুমকি দেওয়া শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সংগঠনটির নেতারা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সম্প্রতি যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ শিবির নেতারা জানান, নিজেদের কলঙ্ক ঢাকতে ছাত্রদল এখন ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে জড়িয়ে নোংরামি করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতারা বিভিন্ন সময়ে নারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং, স্লাটশেমিং, ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত। এ ধরনের নোংরা রাজনীতিতে ছাত্রদল ফ্যাসিস্ট ছাত্রলীগের মতোই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তাদের হাতেই ২০০২ সালে বুয়েটের মেধাবী নারী শিক্ষার্থী সাবেকুন্নাহার সনির রক্ত লেগে আছে। তারা নিজেদের কলঙ্ক ঢাকতে শিবিরের ওপরে দোষ চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য ডাকসু নির্বাচনের আগে শিক্ষার্থীদের কাছে সাধু সাজা। ছাত্রদলের হাতেই ঢাবির শামসুন্নাহার হলে ২০০২ সালে শত শত নারী শিক্ষার্থী নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়। অথচ আজ তারাই উল্টো ছাত্রশিবিরকে অভিযুক্ত করছে- যা ধৃষ্টতা ও মিথ্যাচারের সীমা অতিক্রম করে।
তারা আরো বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে জানাচ্ছি, অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনোভাবেই ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত নয়। বরং তার অনৈতিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে শাস্তির আওতায় আনে। অপরাধীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেই।’ নেতারা বলেন, ছাত্রশিবির নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সম্মানের প্রশ্নে কখনোই আপস করে না। কিন্তু নারী নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে ব্যবহার করে সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে থাকা ছাত্রদলের আসল চেহারা আজ সবাই চিনতে পেরেছে। আমরা ছাত্রদলকে হুঁশিয়ার করে বলতে চাই, ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে মিথ্যা প্রচারণা থেকে বিরত থাকুন। কোনো কিছু হলেই শিবিরকে দায় দিয়ে দাও-এর মতো জঘন্য দেউলিয়াপনার রাজনীতি বন্ধ করুন। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ও ওপেন ইনফরমেশনের এ যুগে শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করে দেবে, নারী নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে অপপ্রচারের জবাব কীভাবে দিতে হয়।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন নিয়ে রিট করা শিক্ষার্থীকে ‘গণধর্ষণের’ হুমকি দেওয়া শিক্ষার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত বলে একই অভিযোগ করেছেন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ মনোনীত বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের ভিপি পদপ্রার্থী আব্দুল কাদের। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের বাইরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ছাত্রশিবির ৫ আগস্টের পর থেকে এখনো গুপ্ত রাজনীতি করে। এখনো তারা তাদের কমিটিগুলো প্রকাশ করে নাই। তাই, কে শিবিরের বা শিবিরের না সেটা বলা কঠিন। কিন্তু আমরা সোমবার গণধর্ষণের হুমকিদাতা আলী হুসেনের আইডি দেখলাম, সেখানে তার ছাত্রশিবিরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেখানে তাকে শিবির না বলে অস্বীকার করলেও তো বোঝা যায়, সে শিবিরের কিনা।’
