ছবির ক্যাপশন:
দেশে বেশ কয়েকটি জেলার হাসপাতালে আছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। এই কেন্দ্র চালুর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পাঠানো হয়েছে কয়েক বছর আগেই। কিন্তু অনেক জায়গায় সেই যন্ত্রপাতিগুলো পড়ে আছে বাক্সবন্দী অবস্থায়। কোথাওবা পরিপাটি করে এই ইউনিট সাজানো থাকলেও সেটি ব্যবহৃত হয় না। ফলে আইসিইউর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সেই জেলার বা এলাকার মানুষ। চুয়াডাঙ্গায় ২০২১ সালের ২৬ জুলাই আইসিইউ সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন চিকিৎসা-সামগ্রী নিয়ে চিকিৎসক, নার্সসহ ৪৪ জনের জনবল সদর হাসপাতালে পৌঁছায় সাজেদা ফাইন্ডেশনের একটি দল। সেদিন থেকেই সদর হাসপাতালের কোভিড ইউনিটের চতুর্থ তলায় আইসিইউ স্থাপন কার্যক্রম শুরু করেন তাঁরা।
২০২১ সালের ৭ আগস্ট নানা জল্পনা কল্পনা শেষে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ছয় শয্যার ইনসেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) ও আট শয্যার হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটের (এইচডিইউ) উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেদিনই করোনা ইউনিট রেড জোন থেকে একজন মূমূর্ষ রোগীকে আইসিইউ ইউনিটে ও তিনজনকে এইচডিইউ ইউনিটে নেওয়া হয়েছে। ২৬ জুলাই আইসিইউ সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে চিকিৎসক, নার্সসহ ৪৪ জনের জনবল সদর হাসপাতালে পৌঁছায় সাজেদা ফাউন্ডেশনের একটি দল। সেদিন থেকেই সদর হাসপাতালের কোভিড ইউনিটের চতুর্থ তলায় আইসিইউ স্থাপন কার্যক্রম শুরু করে তাঁরা। সকল জটিলতা কাটিয়ে ৭ আগস্ট আইসিইউ ইউনিট ও এইচডিইউ ইউনিটের উদ্বোধন করা হয়। এই আইসিইউ ও এইচডিইউ ইউনিটে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা, হাইফ্লো মেশিন ও বাইপ্যাট মেশিন ব্যবস্থা রাখা হয়। পরে করোনা মহামারী উত্তোরণ ও সাজেদা ফাউন্ডেশনের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় আইসিইউ ও এইচডিইউ সেবা কার্যক্রম।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জুন মাসে কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্পের আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ১০ বেডের আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করে। প্রয়োজনীয় জিনিপত্রগুলো সদর হাসপাতালের ২৫০ শয্যার ভবনের ৭ম তলায় ঘরবন্দি করে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নানা সমস্যার কারণে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। সেখানেই অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। জরুরি মুহূর্তে মুমূর্ষ রোগীরা আইসিইউ থেকে চিকিৎসা সেবা না পাওয়ায় মৃত্যুর মুখে পড়ছেন। অনেক রোগীর স্বজনরা মুমূর্ষু অবস্থায় রোগীদের রাজশাহী, খুলনা, ঢাকায় নিচ্ছেন চিকিৎসার জন্য। অনেকে বেসরকারি হাসপাতাল নিচ্ছেন। যার কারণে চিকিৎসা খরচ ব্যয়বহুল হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় আমাদের হাসপাতালে দশ বেডের একটি আইসিইউ ইউনিট রয়েছে। প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় সচল করা সম্ভব হচ্ছে না। চালুর ব্যবস্থা হলে রোগীরা পাবেন। দেশে করোনার কিছু রোগী সনাক্ত হচ্ছে। পাশের দেশে করোনার প্রকোপ বাড়ছে। সতর্কতা হিসেবে আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। কিছু কিছু রোগী পাচ্ছে করোনার উপসর্গের সঙ্গে মিল রয়েছে। কীট না থাকায় পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।’
২০২০ সালে পাঁচ বেডের আইসিইউ ইউনিট চালু হয় বান্দরবান সদর হাসপাতালে। কিন্তু পাঁচ বছরেও সেই কেন্দ্র চালু হয়নি। অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকা কক্ষটি ব্যবহৃত হচ্ছে স্টোররুম হিসেবে। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত না হওয়ায় কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। ২০২৩ সালে ১০ বেডের আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে। সেই অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি সরবরাহও করা হয়। কিন্তু হাসপাতালের একটি রুমে সেগুলো পড়ে আছে। অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতিগুলো। ২০২১ সালে দ্বীপজেলা ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল (সদর) হাসপাতালে ৬ বেডের আইসিইউ ইউনিট চালু করা হয়। তবে গত চার বছরেও আইসিইউ ইউনিটটি চালু হয়নি। মাদারীপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ২০২৩ সালের অক্টোবরে স্থাপন করা হয় আইসিইউ ইউনিট। সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতিও রয়েছে ১০ শয্যার ইউনিটে। তবে এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চালু করা যাচ্ছে না ইউনিটটি।
এমন উদাহরণ অসংখ্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আইসিইউ ইউনিট এবং পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি থাকার পরেও কেন চালু হচ্ছে না? উত্তর একটাই- বিশেষায়িত এই ইউনিট চালুর জন্য প্রশিক্ষিত যে পরিমাণ জনবল দরকার সেটি নেই। ফলে হাসপাতালে আইসিইউ থাকলেও সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। ঢাকা কিংবা বিভাগীয় শহরের চিত্রটিও যে সুখকর তা নয়। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজে হাসপাতাল, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জের জেনারেল হাসপাতাল (ভিক্টোরিয়া), মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালসহ বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শেরপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, বাগেরহাট জেলা সদর হাসপাতালের আইসিইউ সেবা মিলছে না জনবল সংকটের কারণে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানেও আইসিইউ বেডের সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় জনবল না বাড়ায় মিলছে না কাঙ্খিত সেবা। সম্প্রতি চমেক হাসপাতালে নতুন ৩০ বেডের আইসিইউ চালু হওয়ায় মোট আইসিইউ বেডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০। তথ্য অনুযায়ী, এই ইউনিটের জন্য প্রয়োজন ১৮০ জন নার্স, আছে মাত্র ৬৭ জন। এছাড়া রয়েছেন ৩২ জন মেডিকেল অফিসার ও ১০ জন কনসালটেন্ট, যাদের অধিকাংশই অস্ত্রোপচার কক্ষে ব্যস্ত থাকায় আইসিইউতে সরাসরি দায়িত্বে থাকেন না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে মোট আইসিইউ বেড আছে ১ হাজার ১৯৫টি। ঢাকা মহানগরে ৮২৬টির মধ্যে ৩৮৪টি সরকারি হাসপাতালে, বাকি ৪৪২টি বেসরকারি হাসপাতালে। আর ঢাকার বাইরে ৩৬৯টি। আইসিইউর প্রায় ৭৫ শতাংশ ঢাকা বিভাগে। ৩৪ জেলা শহরেই নেই আইসিইউর ব্যবস্থা। তাই এই সেবা নিতে রোগীরা সব সময় ঢাকামুখী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিটিক্যাল কেয়ার সোসাইটির গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি আইসিইউ বেডের জন্য দিনে কমপক্ষে একজন করে নার্স থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই জনবল হাসপাতালগুলোতে নেই। অপারেশন ও আইসিইউ চালানোর জন্য দরকার কমপক্ষে ১০ হাজার শিক্ষক ও চিকিৎসকের। আছে প্রায় ২ হাজার ১শ জন। অ্যানেসথেসিয়া সংকটের কারণে নিয়মিত রুটিন অপারেশন করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। পদ আছে বিশেষজ্ঞ নেই। যার কারণে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে আইসিইউ অ্যানেসথেসিয়ার কার্যক্রম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় শ্বাসকষ্টের রোগী বেড়ে যাওয়ায় কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের অধীনে ৪৮ জেলায় সরকারি হাসপাতালে ১০ বেডের আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়। এর জন্য ৫১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। সে হিসেবে একটি আইসিইউ প্রতিস্থাপনে খরচ হয়েছে গড়ে ১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৩ জেলায় আইসিইউ সেবা চালু হয়েছিল। জনবল সংকটে কিছু জেলায় আইসিইউ সেবা বন্ধ হয়ে যায়। গত ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। ফলে ফেরত যাচ্ছে প্রকল্পের ১৪৬ কোটি টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, আইসিইউ স্থাপনের জন্য যে জনবল দরকার, আমাদের সেই জনবল নেই। টাকা দিয়ে আইসিইউ ইউনিট হয়তো স্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া কঠিন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ জানান, আইসিইউ ইউনিট পুরোপুরি কার্যকর করার জন্য তিনটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান দরকার। ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ বা স্ট্রাকচার তৈরি; প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং এটি পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবলের সংস্থান। সরকার টাকা খরচ করে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ করলেও নানা সংকটে অনেক বেড পড়ে আছে শুধু জনবল সংকট ও সমন্বয়হীনতার কারণে। আইসিইউ সেবা সচল রাখা গেলে বহু মানুষের জীবন রক্ষা হতো। দুঃখের বিষয়, সচল করা যাচ্ছে না। এতে একদিকে রোগীর ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব পড়ছে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের উদ্যোগ নেয়া দরকার।
জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, দেশে আইসিইউ পরিচালনায় যে সংখ্যক জনবল দরকার তা নেই। জনবল সংকট রয়েছে। তাই অনেক জেলায় স্থাপিত আইসিইউ পড়ে আছে। জনবল রাতারাতি তৈরি সম্ভব নয়। সমস্যা কাটাতে কাজ করছি। জনবল নিয়োগে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে।
