ছবির ক্যাপশন:
২০২৪ সালের জুলাই মাস জনমনে এক দুঃসহ স্মৃতির নাম। সন্তানহারা মায়ের বুকফাটা কান্না আর স্বামীহারা স্ত্রীর বেদনার মাস; হাত-পা ও চোখ হারানো যোদ্ধাদের বোবাকান্না নিয়ে বেঁচে থাকার যন্ত্রণার স্মৃতি। দেশবাসীর ওপর প্রভুত্ব কায়েম করে দুর্দান্ত প্রতাপে শাসন-শোষণ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন শেখ হাসিনা। জুলাই ছিল শেখ হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাস। অন্যায়-অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়ন, গুম, খুন, ফাঁসি আর জেল-জুলুমের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত জেগে ওঠার মাস। শেখ হাসিনার ক্ষমতার মসনদ যখন কেঁপে উঠেছিল, তিনি বুঝতে পারছিলেন ক্ষমতা যায় যায়, তখনই তিনি ছাত্র-জনতাকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেন। সরাসরি শেখ হাসিনার নির্দেশনা পেয়েই গণহত্যায় মেতে ওঠে তার অনুগত পুলিশের কতিপয় খুনি সদস্য। এটি ছিল স্বাধীনতার পর ছাত্র-জনতার ওপর বর্বরতম হামলা। জুলাই আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি চালানোর নির্দেশসংবলিত ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ডের সত্যতা যাচাই করেছে বিবিসি। এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদ সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা তার নিরাপত্তাবাহিনীগুলোকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে 'প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার' করার অনুমতি দিয়েছেন এবং 'তারা (এসব বাহিনীর সদস্যরা) যেখানেই তাদের (আন্দোলনকারী) পাবে, গুলি করবে।' ১৮ জুলাইয়ের ফাঁস হওয়া রেকর্ডিংয়ের কণ্ঠের সাথে শেখ হাসিনার কন্ঠস্বরের মিল শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ যে গণহত্যা চালিয়েছিল তা বেরিয়ে এসেছে। বিবিসি বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে কমপক্ষে ৫২ জন নিহত হন। এ দিন বিকেলে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে পুলিশ বলছে, 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে তৎকালীন পুলিশবাহিনীর কিছু সদস্য অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে অপেশাদার আচরণ করেছিলেন।' জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জুলাই-আগস্টে এক হাজার চার শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু। সন্দেহ নেই, জুলাইয়ে যেসব স্থানে ছাত্র-জনতা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল যাত্রাবাড়ী ছিল তার অন্যতম। জীবন বাজি রেখে সেখানে তারা শেখ হাসিনা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন; কিন্তু আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের যারা সে দিন ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছিল তারা কি সবাই আইনের আওতায় এসেছে? আমরা জানি না। আমরা শুধু যাত্রাবাড়ীর জুলাই শহীদ-স্বজন ও আহত যোদ্ধাদের কান্নার আওয়াজ শুনি আর তাদের বিচার পাওয়ার প্রতীক্ষার প্রহর গুনি। আমরা জুলাই হত্যার বিচার চাই। শেখ হাসিনা ও হত্যাকাণ্ডের অন্যান্য কুশীলবসহ যারাই জড়িত বিচারের মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ আশা করে, জুলাইয়ের শহীদদের রক্তাক্ত পথ বেয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্র্বতী সরকার এই নৃশংস গণহত্যার বিচারে কখনোই শৈথিল্য দেখাবে না। আগামী নির্বাচনে জিতে যারা ক্ষমতায় আসার আশা করছেন তারাও এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
