ছবির ক্যাপশন:
আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ১৯৭৬ সালের এই দিনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে রাজশাহীর পদ্মাপাড়ে এ কর্মসূচি পালিত হয়। কিন্তু আজও ভারতের পানি আগ্রাসন থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি। বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশটির সাথে আমাদের রয়েছে অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানিপ্রবাহ। এর মধ্যে প্রধান গঙ্গা, যা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পদ্মা নামে প্রবাহিত। সেই পদ্মায় ফারাক্কা নামক স্থানে বাঁধ দিয়ে ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। এতে বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। ফলে আমাদের বিস্তীর্ণ এলাকার প্রাণ-প্রকৃতি মহাবিপর্যয়ে পড়েছে। উত্তরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে মরুকরণ। পাউবোর তথ্যমতে, ফারাক্কার কারণে উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট-বড় ৫৩টি নদ-নদীর পানিপ্রবাহ এখন বিপন্ন। এতে দেশে নদীনির্ভর সংস্কৃতি বিলুপ্ত হওয়ার পাশাপাশি বিনষ্ট হচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকা। যেখানে আগে খরস্রোতা নদী ছিল সেখানে এখন ধু-ধু প্রান্তর। বিভিন্ন জেলায় নদীমৃত্যুতে ভূ-প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, অস্তিত্বসঙ্কটে সুন্দরবন। ফারাক্কার কারণে বিগত ৫০ বছরে আমাদের অর্ধশতাধিক নদী কার্যত মরে গেছে। নাব্যতা হারিয়ে, লবণাক্ততা বেড়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী বর্তমানে অস্তিত্বসঙ্কটে। ফারাক্কা বাঁধের জন্য পদ্মার গতিপথ থেকে শুরু করে এর শাখা নদীগুলোতে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। অনেক স্থানে পদ্মা সরু খাল হয়ে কোনোমতে টিকে আছে। পদ্মায় পানিপ্রবাহ ক্ষীণ হওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছয়টি নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। নিষ্কাশন মুখ বন্ধ হয়ে বর্ষাকালেও এসব নদী বদ্ধ খাল হয়ে থাকে। শুকিয়ে যাওয়া শাখা নদী বড়াল এখন সরু নালা। জেগে উঠেছে বিশাল চর। কুষ্টিয়ার গড়াইও মৃতপ্রায়। কুমার, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, কপোতাক্ষ কার্যত মৃতই। এসব নদ-নদীর কোথাও কোথাও নামমাত্র পানি প্রবাহিত হয়। গঙ্গার শাখা পাগলা নদী পাঁচ যুগ আগেও গভীর ছিল। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শাহবাজপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দীর্ঘ ৪১ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কালীনগরের কাছে মহানন্দায় পড়েছে। এককালের খরস্রোতা নদীটি এখন সরু খাল। এদিকে মহানন্দায় বছরের মাত্র চার মাস পানি থাকে। বাকি সময় খটখটে শুকনা। নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় এর দু'কূলের সেচপ্রকল্পগুলোতে গত কয়েক বছরে সেচকাজ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বিগত অর্ধশত বছরে রাজশাহীর ১১টি নদ-নদী হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে আছে, নারদ, সন্ধ্যা, স্বরমংলা, নবগঙ্গা, দয়া, হোজা, বারাহী, চিনারকুপ ও মুসাখান। মূলত ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারত গঙ্গার পানি সরিয়ে নেয়ায় পদ্মায় পানি কম আসে। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানিপ্রবাহ আরো কমে যায়। গত ৫০ বছর ধরে যার বিরূপ প্রভাবের শিকার বাংলাদেশের দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও জলজসম্পদ। পানি হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতির প্রধানতম নিয়ামক। তাই যেকোনো মূল্যে পানির ন্যায্য হিস্যা ভারতের কাছ থেকে আদায় করতেই হবে। প্রয়োজনে দেশটির অন্যায্য ও বেআইনি কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলতে হবে। তবে এর আগে গঙ্গা ও তিস্তা নিয়ে ভারতের সাথে চুক্তি সম্পাদনে সম্ভব সব রকম চেষ্টা চালানো উচিত বলে আমরা মনে করি।
