ছবির ক্যাপশন:
মেহেরপুরের অর্ধশতাধিক করাত কলই চলছে অবৈধভাবে
বিশেষ প্রতিবেদক, মেহেরপুর: নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মেহেরপুর জেলার তিন উপজেলার ৫৩টি স’ মিল (করাত কল) অবৈধভাবে চলছে। দীর্ঘ বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় এ অবৈধভাবে স’মিল (করাত কল) চললেও প্রশাসন ও বন বিভাগ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে। জেলার সবগুলো করাত কলের লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনকে ফাকি দিয়ে দিনের পর দিন অবৈধভাবে কি করে এই স’মিল (করাত কল) চলছে এ প্রশ্ন জনগনের। আর লাইন্সেস না থাকায় গাছ কেনা-বেচার ক্ষেত্রেও বিধি নিষেধ না মেনে করাতকল মালিকরা অবাধে কিনছেন যে কোন গাছ। ফলে একদিকে যেমন বেড়েই চলেছে অবাধে বৃক্ষ নিধন বা গাছ কর্তন তেমনি প্রতিনিয়ত হুমকির সস্মুখিন হচ্ছে পরিবেশ। স মিল গুলোতে বিভিন্ন গাছের তালিকা রেজিষ্টার খাতা না থাকায় কোনটি বৈধ বা কোনটি অবৈধ তা বোঝার উপায় না থাকার কারনে বিপুল পরিমান সরকারী কর ফাঁকি দিতে কোন বেগ পেতে হচ্ছে না জেলার করাতকল বা স মিলের মালিকদের। পাশাপাশি অবাধে চোরাই গাছ ক্রয় ও কাঠ কাটা হচ্ছে এসব অবৈধ স মিল গুলোতে। তাছাড়াও বিভিন্ন গাছ অবৈধ পথে কেটে ভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে লাইসেন্স না থাকায় এসব মিল থেকে প্রতি বছর মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এছাড়া তদারকির অভাবে রাতের আঁধারে অসাধু ব্যবসায়ীরা গাংনী উপজেলার রাস্তার দুপাশের সরকারি গাছ কেটে এ সব স’ মিলে চেরাই করছেন। ফলে উজাড় করা হচ্ছে বৃক্ষসম্পদও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার তিন উপজেলা মেহেরপুর সদর উপজেলায় মেহেরপুরের শহরের মের্সাস খান স মিল, মের্সাস মসলেম স মিল, বিশমিল্লা স মিল, সহরাব স মিল, শুভ স মিল, জেড স মিল, মান্নান স মিল, রহুল স মিল, আলমগীর স-মিল, মানিক মিয়া স-মিল, থ্রি বাদ্রার্স স-মিল উষা, লতা স-মিল, কবির স-মিলস, সীমান্ত স-মিলর্স রাবেয়া স-মিল ও পাভেল স-মিল। এছাড়াও সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামের এরফান স-মিল, খান স-মিল, বিশমিল্লাহ স-মিল, হক স-মিল, বাড়াদি বাজারের আদর্শ স- মিল এন্ড টিম্বার, মিজান ব্রাদাস স-মিল, দরবেশপুরের রোকনুজামান স-মিল, মিজান ব্রার্দাস স-মিল, নুরপুরের জামিরুল স-মিল ও কোলার মোড়ের নজরুল স-মিল মোট ২৫টি স-মিলের সবগুলো অবৈধ।
গাংনী গাংনী উপজেলায় বন বিভাগের হিসেব মতে ১৫টি স-মিল রয়েছে কিন্তু এরবাইরেও অনেক স-মিল রয়েছে যেগুলোর হিসেব তাদের জানা নেই। এরমধ্যে গাংনী শহরের মধ্যে আমেনা স-মিল, দেলু স-মিল, হেলাল স-মিলর্স, আবুল খায়ের স-মিলর্স, হায়াত আলী স-মিলর্স, সুমন স-মিলর্স ও ভাই ভাই স মিলর্স। আর পৌর শহরের বাইরে বন বিভাগের হিসেবে, ধানখোলায় শাওন স-মিল, করমদি নজরুল স-মিল, বামন্দীর রনি স-মিলর্স, ভবানীপুরের নবীর স-মিলর্স, জোরপুকুরিয়ায় আমিরুল স-মিল, গাড়াডোবের সাইফুল স-মিলর্স, বাউটের রুম্পা স-মিলর্স ও শাহেবনগরের শাহবউদ্দীন স-মিলের হিসেব থাকলেও এরবাইরে গাংনীতে আরো ৭-৮টি স-মিল চলছে। এদিকে মুজিবনগর উপজেলার ১০ টি স মিল এরবাইরেও রয়েছে বেশ কয়টি যার হিসেব নেই বনবিভাগে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে কেদারগঞ্জ বাজারে হীরা স-মিল, হিসাব স-মিল, দারিয়পুরের হাবিব স-মিল, প্রাপ্তি স-মিল, সাব্বির এন্টার প্রাইজ, কোমরপুরের মের্সাস আব্দুল্লা স-মিল ও জামান স-মিল ও জামান-২ স-মিল সব মিলিয়ে মেহেরপুরের বিভিন্ন হাট, বাজার ও বাগান এলাকায় সরকারী হিসেবে ৫৩টি স’ মিল রয়েছে। স’ মিল পরিচালনার জন্য সরকারি বিধিনিষেধ থাকলেও মিল মালিকরা এসব বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করছেন না। এছাড়া জেলায় মোট কতগুলো স’ মিল রয়েছে তারও কোনো সঠিক হিসাব নেই প্রশাসনের কাছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, এসব স’ মিলে প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন চোরাই গাছসহ বিভিন্ন রাস্তার সরকারি গাছ কেটে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। মেহেরপুরের সড়কের দুপাশে বিভিন্ন প্রজাতির বনজ ও ঔষধি গাছ রয়েছে। প্রায় সময়ে এসব গাছ কর্তন করে এক শ্রেনির মানুষ। আর অবৈধভাবে গাছ কেটে বিক্রি করে পাওয়া অর্থের একটি ভাগ কোন একটি মহল পেয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে জেলার তিনটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় যত্রতত্র গড়ে ওঠা মিলে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে বিভিন্ন প্রকার ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ চেরার কাজ। কিন্তু প্রত্যেক দিন অসংখ্য গাছ চেরানো হলেও মিলের রেজিস্টার খাতায় রাখা হয় না কোনো তথ্য। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, দিনে মোট কী পরিমাণ গাছ (কাঠ) চেরা হলো এবং প্রতিটা গাছের উত্স সম্পর্কে রেজিস্টার খাতায় উলে¬খ করার বিধান রয়েছে। সেই সঙ্গে স’ মিল মালিককে প্রতি মাসে এসব হিসাব বন বিভাগের কাছে জমা দেয়ারও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদিকে স মিলের সাথে আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে যত্রতন্ত্র ভাবে ফেলে রাখা হয় কাঠ। এরফলে যেকোন সময়ে বড় দূর্ঘটনার আসংকা থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে জেলার আঞ্চলিক সড়ক মহাসড়ক গুলোতে রাতের আধারে ছিনতাই কারীরা এসব ফেলে রাখা কাঠ ব্যবহার করে গাড়ীর গতিরোধ করে ডাকাতি করে। এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বা ছোট খাট যেকোন সমস্যায় এসব অবৈধ মিলের এলোমেলো ফেলা রাখা কাঠ দিয়ে পথঅবরোধ করে থাকে।
মেহেরপুরের কোনো স’ মিলেই মানা হচ্ছে না এসব নিয়ম। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি মিলে দিনে অল্প পরিমাণে হলেও রাতে কাঠ চেরার ধুম পড়ে। অথচ করাত কল আইনে সন্ধ্যা ৬টার পর কাঠ চেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
তবে রেজিস্টার ছাড়া মিলে কোনো প্রকারের কাঠ চেরাই করা হয় না বলে জানিয়েছেন স’ মিল মালিকরা। তারা বলছেন, মিলে আসা প্রত্যেকটি কাঠ খাতায় এন্ট্রি কারানোর পর চেরাই করা হয়। রাত অবধি কাঠ চেরাই করেন কিন্তু এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, এখানে একে অপরের পরিচিত, কেউ যদি দ্রুত কাঠ চেরাই করার জন্য অনুরোধ করে সে ক্ষেত্রে অনেক সময় রাত অবধি মিল চালু রখতে হয়। আবার অনেক সময় গ্রাহকের চাপ বেশি থাকলে মাঝে মধ্যে রাতে কাঠ চেরাই করতে হয়। তবে কখনো কোনো মিলে চোরাই কাঠ চেরাই করা হয় না। তবে ২০১২ সালের বন বিভাগের আইন অনুযায়ী লাইন্সেস বিহীন কোন করাত কল চললে প্রতিষ্ঠানের মালিককে ৩ বছরের জেল অথবা ৩ লক্ষ টাকা পযন্ত জরিমানা করার বিধান রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া মিল পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেরপুুরের পাভেল স মিলের মালিক মসলেম উদ্দীন জানান, মিলের লাইসেন্স করার জন্য বিভিন্ন অফিসে ঘোরাঘুরি করেও সঠিক সময়ে লাইসেন্স পাওয়া যায় না। মাসের পর মাস লাইসেন্সের জন্য হয়রানির শিকার হতে হয়।
মেহেরপুর জেলা করাত কল মালিক সমবায় সমিতি লিঃ সভাপতি আতাউর রহমান আতা জানান, বেশ কয়েক বছর আগে আমাদের লাইন্সেস ছিলো। কিন্তু যেকোন কারণে নবায়ন না করতে পেরে আমরা অবৈধ হয়েছি। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও বন বিভাগের লাইন্সেস ছাড়াই কিভাবে এ তো গুলো করাত কল চলছে এ প্রশ্নের জবাব মেলেনি। গাংনী উপজেলার প্রায় ১৫ টি অবৈধ করাত কল (স মিল) কিভাবে চলছে এ প্রশ্নের জবাবে গাংনী এসএফএনটিসির কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম জানান, পৌর এলাকার সবাই লাইন্সেস করতে চেয়েছে। আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ করেছি। এরআগে অনেকের লাইন্সেস ছিলো। ইতোমধ্যে আমরা কয়েকটি করাত কলে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে জরিমানা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মেহেরপুর এসএফএনটিসির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাফর উল্লাহ জানান, এক সময়ে জেলায় ১৫ থেকে ২০টির মত করাত কলের লাইন্সেস ছিলো। করাত কল ২০১২ আইনে যদি কোন ব্যক্তি লাইন্সেস গ্রহণের পরবর্তি এক বছরের মেয়াদ থাকে। এরমধ্যে নবায়ন ফ্রি জমা দিতে হবে। কোন প্রতিষ্টান যদি নবায়ন করে তবে সয়ংক্রীয় ভাবে লাইন্সেস বাতিল বলে গন্যহবে। করাতকল বিধি অনুসারে সকল করাত কল অবৈধ। তবে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে সব গুলো করাত কল মালিকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে লাইন্সেস নেওয়ার ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছি। এবং গত মাসের ১৭-০৯-১৭ ইং তারিখের জেলা সমন্বয় সভায় এবিষয়ে অবহিত করা হলে জেলা প্রশাসক মোাখিক ভাবে করাত কল গুলোকে মোবাইল কোর্টের আওতায় আনার কথা জানান। এরপরও আমি মেহেরপুর জেলা প্রশাসক, মেহেরপুর সদর ও মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে লিখিত ভাবে অবহিত করি। আমি খুব অল্প সময়ে যোগদান করে এগুলোর বেশি কিছু করা আমার জন্য সম্ভব হয়নি।
মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সিনিয়র কেমিষ্ট মিজানুর রহমান জানান, করাত কল স্থাপনের আগে আমাদের নিকট ছাড়পত্র নিতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ মালিক করাত কল স্থাপন করার পর যখন বিদ্যুৎ সংযোগের দরকার হয় তখন আমাদের নিকট আবেদন করে। মেহেরপুর জেলার বেশ কয়েকটি আবেদন এখনও আমাদের অফিসে জমা রয়েছে। তবে আমাদের আইন না মেনে করাত কল স্থাপন করলে পরিবেশ আইনের ১২ ধারায় ৩ বছরের জেল দেওয়ার বিধান আছে। গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি আনোয়ার হোসেন জানান, অবৈধ হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন গত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমি এরআগে অবহিত ছিলাম না। গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফ-উজ-জামান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যোগাযোগ করা হবে। বিষয়টি ভালো ভাবে খোজ নিয়ে অবৈধ হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মেহেরপুর জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ জানান, আমি ইতোমধ্যে অবহিত হয়েছি জেলার সকল স মিল (করাত কল) অবৈধ। আমরা উদ্দ্যোগ নিয়ে তাদেরকে লাইন্সেসের জন্য তাগিদ দিয়েছি। তারা লাইন্সেস না করলে আমরা মোবাইল কোর্ট করে অবৈধ করাত কল গুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
