ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গার গ্রাম থেকে শহরের পথে পথে ঘুরে পাঠকদের বইয়ের জগতে নিয়ে যাওয়া ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি আজ বন্ধ হওয়ার শঙ্কায়। এই লাইব্রেরি শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, এটি ছিল হাজারো পাঠকের স্বপ্ন দেখা, জ্ঞান অর্জন এবং নতুন পৃথিবী আবিষ্কারের এক মহাসেতু। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করাও এখানে বই পড়ার সুযোগ পেতেন। সাপ্তাহিক বই বিনিময়ের এই কার্যক্রম গড়ে তুলেছিল এক ভিন্নধর্মী সম্পর্ক। কিন্তু এখন সেই বইয়ের গাড়ি হয়তো আর দেখা যাবে না, এটি জানার পর থেকে চুয়াডাঙ্গা ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির বিভিন্ন স্পটের পাঠকেরা হতাশা প্রকাশ করেছে।
জানা যায়, ২০০৭ সাল থেকে ঝিনাইদহ ইউনিটের ‘ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি’র একটি গাড়ি সপ্তাহে একদিন চুয়াডাঙ্গা শহরে প্রথম যাত্রা শুরু করে আলোকিত মানুষের সন্ধানে। ২০১৯ সালের জুলাই মাস থেকে চুয়াডাঙ্গা জেলা ইউনিটের যাত্রা শুরু হলে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকা, আলমডাঙ্গা, দর্শনা, জীবননগরসহ জেলার মোট ৪৫টি স্পটের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির এই গাড়িটি নানা-রকম বই নিয়ে পাঠকের সামনে দোরগোড়ায় হাজির হতো। চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলায় ২ হাজার ৭০২ জন পাঠককে এই লাইব্রেরি নিয়মিত বই প্রদান করে আসছিল। গত শুক্রবার বন্ধের নির্দেশনা পাওয়ার আগের দিনও লাইব্রেরিটি পাঠকদের বইয়ের চাহিদার জোগান দিয়েছে।
কথা হয় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের চুয়াডাঙ্গা ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির চাঁদমারী মাঠ স্পটের বিভিন্ন বয়সী পাঠকদের সঙ্গে। লাইব্রেরির নিয়মিত পাঠক চুয়াডাঙ্গা ভিজে উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ইখওয়ানের সঙ্গে। ইখওয়ান বলেন, ‘আমি চতুর্থ শ্রেণি থেকে এই লাইব্রেরির পাঠক। সদস্য নম্বর ১২৪০। এই লাইব্রেরি থেকে ১০০টির বেশি বই পড়েছি। সহজে বই পাওয়ার কারণে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। কিন্তু শুনছি লাইব্রেরিটি আর মাঠে আসবে না। সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য একটুও ভালো কিছু হচ্ছে না। আমরা চাই লাইব্রেরিটি যেন কখনো বন্ধ না হয়।’
সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আমারা আক্তার সিমিন বলেন, ‘লাইব্রেরি থেকে ভালো ভালো বই পাওয়া যেত। বই পড়ে খুব আনন্দ পেতাম। কিন্তু শুনছি লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। খুব মন খারাপ লাগছে। বইয়ের গাড়ি কি আর আসবে না?’
২০১৩ সাল থেকে লাইব্রেরির সদস্য মৌসুমী মৌ। তিনি বলেন, ‘লাইব্রেরিটি শিশু-কিশোর থেকে বয়স্কদের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করেছে। এটি বন্ধ হয়ে গেলে বইপ্রেমীদের মিলনমেলাও বন্ধ হয়ে যাবে। চুয়াডাঙ্গার ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি জেলার মানুষের জ্ঞানচর্চার বড় মাধ্যম। পাঠকদের দাবি, এটি বন্ধ না করে দ্রুত নতুন পরিকল্পনা নিয়ে চালু রাখা উচিত। এতে পাঠ্যাভ্যাস ও বইপ্রেম উভয়ই অক্ষুণ্ন থাকবে।’
লাইব্রেরিয়ান দিপঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, ‘লাইব্রেরির পাঠকদের চাহিদা পূরণে এটি পুনরায় চালু হওয়া জরুরি। আশা করছি, শিগগিরই এই কার্যক্রম আবার শুরু হবে। কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিষয়টি বিবেচনা করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ই-মেইলে নোটিশ পেয়েছি ৩০ তারিখের মধ্যে বইসহ গাড়িটি কেন্দ্রে জমা দেওয়ার। শুক্রবার থেকে আমরা আর লাইব্রেরির কার্যক্রম চালাতে পারছি না। পাঠকেরা ফোন দিচ্ছেন, কিন্তু ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিটি ঢাকায় ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে জানার পর তারা দুঃখ প্রকাশ করছেন এবং লাইব্রেরিটি ফিরিয়ে না নিতে অনুরোধ করছেন।’
উল্লেখ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রম বাস্তবায়ন পরিচালক মো. কামাল হোসাইনের স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়েছে, দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রকল্প (২য় সংশোধিত) ব্যবস্থাপনার চুক্তির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ তারিখে শেষ হচ্ছে। ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর পর কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে।
