ছবির ক্যাপশন:
বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের জঞ্জাল সরিয়ে ত্রয়োদশ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের কমিশনের সামনে পাহাড়সমান চ্যালেঞ্চ। প্রথমত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ এর ভোটারবিহীন নির্বাচন, বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন এমপি বিজয়ী হওয়া, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব এবং অনেক রাজনৈতিক দলের সক্রিয় অংশ না নেয়া এসব নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে ভোটাররা নির্বাচন বিমুখ হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, আওয়ামী লীগ সরকার এ তিনটি নির্বাচনকে একপেশে করার ফলে দেশ থেকে গণতন্ত্র ও নির্বাচন নির্বাসিত হয়েছে। এসব কারণে নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান নাসির উদ্দীন কমিশনের সামনে জাতিকে একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান উপহার দেয়া বেশ কঠিন হবে।
এ বিষয়ে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেছেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা এখানে খাস নিয়তে কাজ করছি এবং করব। এই মুহূর্তে ইসির বড় চ্যালেঞ্জ কী- জানতে চাইলে সিইসি বলেন, আমাদের চ্যালেঞ্জ একটা, তা হলো জাতিকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়া। এটাকেই আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। এটাই আমরা মোকাবিলা করতে চাই। তার জন্য প্রথমত ক্লিন ভোটার লিস্ট তৈরি, ইসির কর্মী ও কর্মকর্তা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে ইসির সক্ষমতা বাড়াতে আইন সংশোধন, যেসব সংসদীয় আসন ডিলিমিটেশন দরকার- সেগুলো পর্যালোচনা করে সীমানা পরিবর্তন, আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ- ভোটাররা যাতে নির্বাচনমুখী হয়; তার জন্য ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করাই হবে আমাদের প্রধান কাজ। এর জন্য গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে সিইসি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে তিনি আগামী ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার প্রাথমিক সময়সীমা দিয়েছেন। আমরাও সেটাকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছি।
সিইসি জানান, ইসির দৃশ্যমান যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে- এর বাইরে আরো বহুবিধ প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে- যেটা আমরাও জানি না। নিত্যনতুন অনেক চ্যালেঞ্জ আসবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। এই দায়িত্বকে জীবনের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছি। তিনি বলেন, দেশের মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দেশের মানুষ আন্দোলন করেছেন, সংগ্রাম করেছেন, রক্ত দিয়েছেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসি সূত্র বলেছে, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর কাজ হচ্ছে। ইসি যাতে কোনো অনিয়ম হলে নির্বাচন বাতিল করতে পারে সে জন্য আইনি ক্ষমতা পাচ্ছে, কর্মী ও কর্মকর্তারা একপেশে আচরণ করলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার আইন আসছে, কিছু সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন হতে পারে এবং একটা সুষ্ঠু ভোটার লিস্ট তৈরি করার কাজ করতে চলেছে।
এদিকে, ইসি সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, বিগত তিনটি নির্বাচন একেবারে একপেশে ও পাতানো হয়েছে। ভোটাররা এতে ভোট দিতে আসেননি। ভোটারবিমুখ নির্বাচন ছিল। তাই নাসির উদ্দিন কমিশনের ওপর বাড়তি দায়িত্ব আছে। এত বছরের জঞ্জাল সরানোর চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। তিনি বলেন- প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পেশিশক্তি, কালোটাকায় ভোট চুরির নির্বাচন ছিল বিগত ৩ নির্বাচন; একটা সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে সম্ভব হয়- সে জন্য সংস্কার কমিশন গঠন করেছে বর্তমান সরকার। ইসি সংস্কারে আমরা কাজ করছি। কিছু আইনি সংস্কার তো আছেই। এছাড়া ইভিএমে ভোট না নেয়া, না ভোট প্রচলন, ইসির ক্ষমতা বাড়ানো, প্রবাসীদের ভোট নিশ্চিত করাসহ কিছু সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতাসহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হচ্ছে। আমরা কিছু সুপারিশ চলতি মাসের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেব।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ মনে করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে একপেশে ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে। এবার নাসির উদ্দিন কমিশনের কাছে সবাই একটা সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করে। তাই একপেশে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কালোটাকা, দলীয় মাস্তানদের ভোট চুরি ও বুথ দখল- এসব চ্যালেঞ্চ মোকাবিলা করে জাতিকে এবার একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেয়া ইসির প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর বাইরেও অনেক চ্যালেঞ্চ মোকাবিল করতে হবে নাসির উদ্দিন কমিশনকে।
এসব বিষয়ে সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, জাতি একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কেউ কেউ এটাকে দ্বিতীয় বিপ্লবও বলে থাকেন। এই ক্রান্তিকালে এই গুরুদায়িত্বটা ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। আমি একটা সলিড টিম (ইসি) নিয়ে কাজ করছি। কীভাবে সামনের দিকে এগোবো তার একটি প্রাথমিক ধারণাও পেয়েছি, সে অনুয়ায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। নাসির উদ্দীন বলেন, নির্বাচনের জন্য যা যা দরকার, তার সবই করা হবে। আমার জীবনে কোনো ব্যর্থতা নেই। আমি কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। অনেক কঠিন কাজ করতে হয়েছে, ব্যর্থ হইনি। ইসির ওপর রাজনৈতিক, দেশি-বিদেশি বা দলীয় চাপ বড় সমস্যা। এটা কীভাবে মোকাবিলা করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি জানান, বর্তমান সরকারের কোনো নিজস্ব এজেন্ডা নেই। কাজেই আমাদের ওপর কোনো চাপ নেই। আমরা কোনো দল বা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এখানে আসিনি। এটা আমাদের জন্য বড় সুযোগ।
ভোটারদের বুথমুখী করতে আপনাদের পদক্ষেপ কী? এ প্রশ্নে সিইসি বলেন, মানুষ এখন ভোটের নাম শুনলে নাক সিটকায়। প্রশ্ন তোলে ভোট দিলে কী হবে? কেউ কেউ বলেন, ভোট রাতে হয়ে গেছে। সরি টু সে, কেউ কেউ বলবেন কুত্তা মার্কা নির্বাচন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, মানুষকে আগ্রহী করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা, নষ্ট আগ্রহ নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করতে মিডিয়ার সহযোগিতা লাগবে। আমরা খাস নিয়তে কাজ করছি- এটাও জানানো আপনাদের দায়িত্ব। খারাপ কাজ আগে যেগুলো হয়েছে, তা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করব। তিনি বলেন, একতরফা নির্বাচনের কারণে দেশের বারোটা বেজে গেছে। আমাদের সব প্রচেষ্টা নিবেদিত থাকবে একটা পরিবেশ সৃষ্টির জন্য, যে পরিবেশে সব ভোটার নিজের ইচ্ছায় পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা। এটার জন্য যা করণীয় তা করা হবে। গায়ের জোরে ইলেকশন করতে যাওয়ায় এসব হয়েছে। আমরা কোনো গায়ের জোরের নির্বাচন দেখতে চাই না। কোনো একতরফা নির্বাচন আমরা দেখতে চাই না। আমরা প্রতিযোগিতামূলক লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে দেব। যাতে নিয়মের মধ্যে সবাই খেলতে পারে। সেটা করতে সরকার/দলগুলো আমাদের সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কিনা- এমন প্রশ্নে সিইসি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে ফয়সালা হলেই আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী দলগুলোর নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। আওয়ামী লীগ প্রশ্নে ফয়সালার বিষয়ে আমরাও অপেক্ষা করছি। ফয়সালাটা কী আসে দেখি। জাতীয় পর্যায়ে একটা ফয়সালা হোক। তাহলে সেভাবে আমরা ব্যবস্থা নেব।
নির্বাচন তো শুধু ইসির ওপর নির্ভরশীল নয়;
স্টেকহোল্ডার- যেমন প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক দল, ম্যাসাল পাওয়ার ও কালো টাকা প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে এগুলো কীভাবে ঠেকাবেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কিন্তু একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে যাচ্ছি। সেখানে প্রসাশনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চয় নিরপেক্ষ আচরণ করবে। তারা সেটাই ব্যক্ত করেছেন, অনেকেই বলেছেন তারা সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছেন, ব্যবহৃত হয়েছেন। আর হতে চান না। তারপরও আপনাদের বিবেচনায় শতভাগ নিরপেক্ষ নির্বাচন নাও হতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে শতভাগ। আগে ডামি নির্বাচন হয়েছে। ১৫৩ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। আমারা এসেছি এগুলো মোকাবিলা করার জন্যই। আমরা দায়িত্বটাকে বড় সুযোগ হিসেবে নিতে চাই। শেষ সময়ে এসে জাতির জন্য কিছু একটা করার সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার আমরা করতে চাই। আমরা যদি এখানে ফেল করি, তাহলে দেশের ভোটের অবস্থা কী হবে, সেটা বুঝতেই পারছেন।
সিইসি বলেন, সংস্কার কমিটির কাছে দলগুলোর কেউ বলছেন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের কথা। কেউ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সরকারের কথা বলছেন। এরকম কিছু হলে তো আমাদের সেভাবে ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। কাজেই এই বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এগুলো ফয়সালা না হলে আমরা কীভাবে ভোট করব? নির্বাচনের জন্য সেসব কমিশন সংশ্লিষ্ট সুপারিশগুলো নেয়ার পর, নির্বাচন করার মতো সবকিছু যখন প্রস্তুত হবে- তখনই আমরা নির্বাচনের তারিখ দেয়ার বিষয়ে চিন্তা করতে পারব।
