ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য অঙ্গনের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব বাবু বনওয়ারী লাল বাগলা আর নেই। তিনি একাধারে ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সাবেক সভাপতি, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন পরিষদ চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সাবেক সভাপতি, কবি, ছোট গল্পকার, লেখক ও সাহিত্যিক। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা ১ মিনিটে তিনি চুয়াডাঙ্গা বাজার পাড়ার নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
প্রয়াত গোপাল বাগলার পুত্র বনওয়ারী লাল বাগলা ছিলেন ৫ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে সবার বড়। তাঁর পূর্বপুরুষ ভারতের রাজস্থান থেকে ১৯১২ সালে বাংলাদেশে আসেন এবং চুয়াডাঙ্গায় ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৩৬ সালের ২২ জুলাই বাবা গোপাল বাগলা ও মা দ্রৌপদী বাগলার কোলজুড়ে আসেন বাবু বনওয়ারী লাল বাগলা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বনওয়ারী লাল বাগলা তার বাবার সাথে চলে যান কলকাতার বাঁশতলার ভাড়া বাসায়। তাঁর লেখাপড়ার শুরু কলকাতায়, কিন্তু ১৯৪৯ সালে পরিবারসহ তিনি পুনরায় চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। চুয়াডাঙ্গা বাজার পাড়ার সেই বাড়িতেই ওঠেন সপরিবারে। এরপর ভর্তি হন চুয়াডাঙ্গা ভিক্টোরিয়া জুবিলি হাইস্কুলে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়ার পর ইতি টানেন। শুরু করেন বাবার ব্যবসা দেখাশোনা, পাশাপাশি ঝুঁকে পড়েন সাহিত্য চর্চায়। গতকাল সোমবার ৯০ বছর বয়সে জন্মস্থানেই সাহিত্য অঙ্গনের এই নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ ঘটে।
এদিকে, বাবু বনওয়ারী লাল বাগলার মৃত্যুতে চুয়াডাঙ্গার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গতকাল দুপুরে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া মাত্রই তাঁর বাড়িছে ছুটে যান চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি সাহিত্যিক ইকবাল আতাহার তাজ, সরদার আলী হোসেন, তৌহিদ হেসেন, কাজল মাহমুদ, আনসার আলী, অ্যাড. বজলুর রহমানসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যবৃন্দ ও শুভানুধ্যায়ীরা।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন দৈনিক সময়ের সমীকরণের প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপনসহ সমীকরণ পরিবার। এছাড়াও তাঁর প্রয়াণে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখা, চর্চায়ন-চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য চর্চা কেন্দ্র, অরিন্দম সাংস্কৃতিক সংগঠন, সংলাপ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, চুয়াডাঙ্গা আবৃত্তি পর্ষদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চুয়াডাঙ্গা জেলা সংসদ, বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখাসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সাহিত্য অঙ্গনের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের শবদেহ নিয়ে মৃত্যুপূর্ব তাঁর ইচ্ছানুযায়ী আজ সকালে জয়ঢাক সহকারে মহাযাত্রা শুরু হবে এবং সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ চত্বরে তাঁর শবদেহ বিভিন্ন সংগঠনের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এরপর তালতলা মহাশ্মশানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এছাড়া আগামী ২৭ ডিসেম্বর বেলা ৩টায় চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ কার্যালয়ে সংগঠনের উদ্যোগে তাঁর স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হবে।
সাহিত্যচর্চা ও অবদান:
সাহিত্য অঙ্গনের নক্ষত্র বনওয়ারী লাল বাগলা স্কুলজীবন শেষ করার পর বাবার ব্যবসার পাশাপাশি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। এসময়ে ছড়া, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাসসহ প্রায় ৫০০-টিরও বেশি সাহিত্যকর্ম তাঁর কলম থেকে এসেছে। তবে সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ সফল হয়নি।
চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের অন্যতম সদস্য কাজল মাহমুদ বলেন, ‘আমি বনওয়ারী লাল বাগলাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর লেখনীর প্রতি যে দরদ এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতা, তা সত্যিই বিস্ময়কর। আমি সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি রবীন্দ্র সংগীতের ভক্ত। রবীন্দ্র সংগীতের কোনো গানের ভাবার্থ পুরোপুরি বুঝতে না পারলে আমি তাঁর শরণাপণ্ন হতাম। তিনি এত সুন্দরভাবে গানের ব্যাখ্যা করে দিতেন, যা আমার মনে বহুদিন অমলিন হয়ে থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘আরেকটি বিষয়ে আমি অত্যন্ত আশ্চর্য্য হতাম-তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন ভারতের রাজস্থানী, যেখানে মারওয়ারি ভাষার চর্চা ছিল। পরিবারে মারওয়ারি ভাষার প্রচলন থাকা সত্ত্বেও বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ, দরদ এবং স্পষ্ট অর্থ বিশ্লেষণের যে ক্ষমতা, তা আমার কাছে সত্যিই মুগ্ধকর ও ভোলার নয়।’
