ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সরোজগঞ্জ বাজারের বিআরএম বেসরকারি হাসপাতালে ভুল অপারেশনে মৃত্যু হওয়া ৮ বছর বয়সী শিশু সুমাইয়া আক্তার চাঁদ মণির ময়নাতদন্ত শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে গঠিত মেডিকেল বোর্ড। পরে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ শিশুটির লাশ দাফনের জন্য পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এদিকে, অনুমতি না থাকলেও চুরি করে বিআরএম বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন হাসপাতালটির পরিচালক হুমায়ুন আহমেদ। যার যথাযথ প্রমাণও পাওয়া গেছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ আগস্ট চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. সাজ্জাদ হাসান জেলায় অবৈধভাবে পরিচালিত হওয়া সকল ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। ১৯ আগস্ট যৌথ অভিযানে নামে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। এদিন বিআরএম বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান পরিচালনাকালে অপারেশন থিয়েটার মানসম্পন্ন না থাকা, সিজারিয়ানে একই ডাক্তার অ্যানেসথেসিয়া দেয়া ও অপারেশন করা এবং ল্যাবেও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়া যায়। এসময় প্রতিষ্ঠানটিকে মেডিকেল প্রাকটিস এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরিজ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮০ এর ১৩ ধারা অনুযায়ী ৫ হাজার টাকা জরিমানা ও বন্ধ করে সিলগালা করা হয়। এরপর থেকে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা সেবা প্রদানের কোনো অনুমতি ছিল না।
এদিকে, গত মঙ্গলবার সকালে ওই হাসপাতালেই চুরি করে ডা. খন্দকার গোলাম মোস্তফা কবীর শিশু সুমাইয়া আক্তার চাঁদ মণির অ্যাপেনডিসাইটিসের অপারেশন করেন। অপারেশন চলাকালীন শিশুটি ব্যথায় চিৎকার শুরু করলে শিশুটিকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করে। তবে কুষ্টিয়া পৌঁছানোর পর শিশুটি মারা যায়। কুষ্টিয়া জেনারলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার দিন শিশুর পরিবার অভিযোগ করেছে যে, ‘অপারেশনের সময় ডাক্তার শিশুটিকে ধমক দিয়ে নির্যাতন করেছেন। এবং ভুল অপারেশনের ফলে শিশুটির অবস্থা শঙ্কটাপন্ন হলে তাকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তড়িঘড়ি হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়। এ ঘটনার পরপরই হাসপাতালের স্টাফরা পালিয়ে যায় এবং স্থানীয়রা হাসপাতালটিতে তালা ঝুলিয়ে দেয়।’ নিহত শিশুর খালু মাহাবুব রহমান দাবি করেছেন, ‘ডা. কবীর ভুল অপারেশন করে আমাদের চাঁদ মণিকে মেরে ফেলেছে। আমরা এর বিচার চাই।’
স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমতি ছাড়ায় কীভাবে হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম ও অপারেশন করলেন, এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হয় হাসপাতালের পরিচালক হুমায়ুন আহমেদের কাছে। এসময় বলেন, ‘আমি একটি আলোচনার মধ্যে আছি। এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না।’ ফ্রি হয়ে কথা বলবেন জানিয়ে তিনি কলটি কেটে দেন।
অ্যাপেনডিসাইটিসের অপারেশনের কোন পর্যায়ে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী পাঠানো হয় এবং কী কারণে শিশুটির মৃত্যু হতে পারে জানতে চাওয়া ডা. খন্দকার গোলাম মোস্তফা কবীরের কাছে। এসময় তিনি জানান, ‘অস্ত্রোপচারের শেষ পর্যায়ে শিশুটির অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায়। এসময় অ্যানেসথেসিয়াসহ যাবতীয় চিকিৎসা দেয়া হলেও শিশুটির অবস্থার উন্নতি হয়নি। ফলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।’ শিশুটির অ্যানেসথেসিয়া দেন কোন চিকিৎসক, জানতে চাইলে তিনি জরুরি সভায় ব্যস্ত থাকার অজুহাত দেখান। এবং পরে কথা বলবেন বলে ফোনটি কেটে দেন।
শিশু সুমাইয়া আক্তার চাঁদ মণির মৃত্যুর বিষয়ে চানতে চাইলে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. তাপস কুমার সরকার বলেন, ‘মঙ্গলবার হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত অবস্থায় পেয়েছিলেন। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া থানায় অবগত করা হয়। এবং আজ (গতকাল বুধবার) বেলা ১১টায় ময়নাতদন্ত বোর্ড শিশুটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।’
কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দিপেন্দ্রনাথ বলেন, ‘এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ হয়নি।’
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আওলিয়ার রহমান জানান, ‘গত ১৯ আগস্ট বিআরএম বেসরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযান চালানো হয়। এসময় হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার মানসম্পন্ন না থাকা, সিজারিয়ানে একই ডাক্তার অ্যানেসথেসিয়া দেয়া ও অপারেশন করা এবং ল্যাবের ব্যবস্থাপনা সঠিক না হওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়া যায়। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানাসহ সিলগালা করে বন্ধ করা হয়। এরপর হাসপাতালটি পরিচালনার কোনো অনুমতি পেয়েছে কি না সে সম্পর্কে আমি অবগত নয়।’ বিআরএম বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুর বিষয়ে এই চিকিৎসা কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে জেনেছি। বিষয়টি জেলা সিভিল সার্জনকে অবগত করা হয়েছে।’
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. সাজ্জাৎ হাসান বলেন, ‘বিভিন্ন অনিয়ম থাকায় সরোজগঞ্জ বাজারের বিআরএম বেসরকারি হাসপাতালটি সিলগালা করে বন্ধ করা হয়। পরবর্তীতে শুধুমাত্র হাসপাতালটির উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বার্থে সিলগালা খুলে দেয়া হয়। তবে সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রমের কোনো অনুমতি দেয়া হয়নি, তারা অনুমতি ছাড়ায় চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়েছে।’
হাসপাতালে ভুল অপারেশনে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে জানার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) ঘটনাটির তদন্ত করবেন। এছাড়াও অনুমতি ছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার দ্বায়ে হাসপাতালের পরিচালকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এদিকে, ময়নাতদন্ত শেষে গতকালই শিশু চাঁদ মণির মরদেহ তার নিজ বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রসুলপুরে নেয়া হয়। বাদ মাগরিব স্থানীয় কবরস্থানে শিশুটির লাশের দাফনকার্য সম্পন্ন করে পরিবার।
