ছবির ক্যাপশন:
চুয়াডাঙ্গায় কয়েকদিনের তীব্র তাপদাহের পর এবার অতি তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। এতে ফসলের ক্ষতিসহ জনজীবনে নেমে এসেছে চরম অস্থিরতা। জেলায় প্রতিদিন তাপমাত্রার নতুন নতুন রেকর্ড করা হচ্ছে। গতকাল শনিবার মৌসুমের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। বেলা তিনটায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এসময় বাতাসে আর্দ্রতা ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ। সন্ধ্যা ছয়টায় তাপমাত্রার পারদ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রির ঘরে।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ এপ্রিল জেলার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর থেকে ক্রমেই উপরে উঠতে থাকে তাপমাত্রার পারদ। ১৩ এপ্রিল ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৪ এপ্রিল ৩৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি ও ১৫ এপ্রিল এ জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৬ এপ্রিল ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টায় ৪০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এটি দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল। এরপর বৃহস্পতিবার (১৮ এপ্রিল) ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এদিন চুয়াডাঙ্গা ও যশোরে যৌথভাবে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টায় ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এটিও সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল।
আবহাওয়া অফিস বলছে, তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেটা মৃদু তাপপ্রবাহ। ৩৮ ডিগ্রি থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি তাপপ্রবাহ। ৪০ ডিগ্রি থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে সেটি তীব্র তাপপ্রবাহ। ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে সেটিকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলে। সে হিসেবে চুয়াডাঙ্গা জেলায় টানা চার দিন তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে চলার পর এবার তাপমাত্রার পারদ আরও বেশি হয়ে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হলো।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ জামিনুর রহমান বলেন, ‘শনিবার বেলা ৩টায় চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সন্ধ্যা ছয়টায় ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। যা এই মৌসুমে এ জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। আপাতত স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে কালবৈশাখী ঝড় হলে তারসঙ্গে বৃষ্টি হতে পারে। এটা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।’
জামিনুর রহমান আরও বলেন, ‘টানা চার দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গায়। তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রির ওপরে গেলে সেটাকে খুব বা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলে। সে হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় আজ (শনিবার) থেকে খুব তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু।’

এদিকে, গরম যেন কমছেই না সীমান্তবর্তী এই জেলায়। তীব্র গরমে ও দাবদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ ও স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই ওপরের দিকে উঠছে তাপমাত্রার পারদ, প্রতিদিনই হচ্ছে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড। বেড়ে চলছে রোগবালাই। ক্ষতির ঝুঁকিতে ধানসহ মাঠের বিভিন্ন ফসল। কাজ কম থাকায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। অতিপ্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের না হওয়ার জন্য সতর্ক করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালানো হচ্ছে প্রচারণা।
চুয়াডাঙ্গা শহরের গৃহিণী তাসলিমা খাতুন বলেন, ‘বাড়িতেও কাজ করতে পারছি না। ছাদ থেকে গরম নামছে। ট্যাংকের পানি গরম। পানি দিয়ে এমনিতেই ভাব উঠছে মনে হচ্ছে। কোথাও শান্তি নেই।’ বড় বাজারের পেয়ারা বিক্রেতা আলম আলী বলেন, ‘পেয়ারা সকালে আনছি। দুপুরের আগেই মনে হচ্ছে শুকিয়ে যাচ্ছে। কাস্টমার আর নিতে চাচ্ছে না। মহাবিপদে আছি এতো গরম তো আর সহ্য হচ্ছে না।’
পান চাষি আকবর মিয়া বলেন, ‘আমার তিন বিঘা পানের বরজ আছে। গরমে অন্য ফসলের সঙ্গে পানেরও বেশ ক্ষতি হবে মনে হচ্ছে। ভয়ে আর বিপদে আছি।’ আম ও লিচুর বাগান মালিক মো. পারভেজ হোসেন বলেন, ‘আমার চার বিঘা আম ও তিন বিঘা লিচু বাগান আছে। এবারে লিচু আর আম দুটোতেই খুব একটা ফলন পাব না। অনেক লিচু ও আমের গুটি গরমে ঝরে যাচ্ছে। একটা বিপদে আছি।’
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তবিবুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে গরমে অ্যাসেম্বলি হবে না। এ ছাড়া তাঁদেরকে বলা হয়েছে, যাতে বাঁচ্চাদের রোদে যেতে না দেয়। বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।’

অতি তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বোরো ধান চিটে হয়ে যাচ্ছে। আমের গুটিগুলো শুকিয়ে ঝরে পড়ছে। নিয়মিত মাঠে ও বাগানে পানি দেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে কৃষকদের। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহ। যার ফলে কৃষিতে প্রভাব পড়ছে। ধানের ফলনে বিপর্যয় ঘটতে পারে। আমের গুটি ঝড়ে যাচ্ছে ও আম পানি না পাওয়ায় কম বড় হচ্ছে। কৃষক ও বাগান মালিকদের নিয়মিত পরিচর্যা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সবজি চাষিদের সেচ প্রদান অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চিটে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। আমে স্প্রে করার জন্য বলা হচ্ছে। আমাদের ব্লক সুপারভাইজার, উপ-সহাকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকলে কৃষকদের মাঠ পর্যবেক্ষণ করাসহ পরামর্শ দিচ্ছেন।’
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) উম্মে ফারহানা বলেন, ‘তীব্র গরমে হার্টের রোগীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছেন, বাড়ছে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি। চিকিৎসা নিতে আসা এসব রোগীদের প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হতে বলা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান, খাওয়ার স্যালাইন, লেবুর শরবত ও তরলজাতীয় খাবার বেশি খাওয়া এবং রোদ থেকে বাঁচতে ছাতা ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক কিসিঞ্জার চাকমা বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। গতকালও আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্ক বার্তা পেয়েছি। আমরা স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শক্রমে সচেতনতামূলক মাইকিং করছি। জেলা পর্যায়ে একটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে, আগামীকাল রোববার (আজ) সেটির সভা আহ্বান করা হয়েছে। আমরা সেখানে আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্ত নেব।’
