ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন:
পাকিস্তানের নির্বাচনের ফল প্রকাশ নিয়ে চলছে নাটক। ভোট গ্রহণের পর এক দিন পার হলেও সব আসনের ফল পাওয়া যায়নি। প্রথম ফল আসতেই সময় লেগেছে ১২ ঘণ্টারও বেশি। যা নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন। অনেকের দাবি, নির্বাচনে কারচুপি করতেই ফল প্রকাশে এই ধীরগতি। যদিও সরকারের দাবি, যোগাযোগ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে বিলম্ব হচ্ছে। এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে সব ধরনের চেষ্টার পরও তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই ভোটের ফলে এগিয়ে রয়েছেন। কারাবন্দি ইমরান খান এক্সে এক বার্তায় বলেছেন, জনগণের চাওয়াকে দমিয়ে রাখতে সাধ্যমতো সব পদক্ষেপ নেওয়ার পরও আজ নির্বাচনে বিপুল অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে জনগণ তাদের রায় দিয়েছেন। আমরা বারবারই বলেছি, যেটা সময়ের দাবি, তাকে কোনো শক্তি দিয়েই ঠেকানো যায় না। ভোট গণনার প্রক্রিয়া যেন সুষ্ঠু হয়, তা নিশ্চিত করাটা এখন জরুরি।
আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত ঘোষিত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ১৫৬ আসনের ফলাফলে ইমরানের পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৬২টি আসনে। নওয়াজ শরিফের পিএমএলএন জিতেছে ৪৬টি আসনে এবং বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির পিপিপি জিতেছে ৩৯টি আসনে। অন্যরা জিতেছে ৯টি আসনে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফলাফলের যে প্রবণতা তাতে কোনো দলেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। যে কারণে জোট গঠনের মাধ্যমেই নতুন সরকার গঠিত হতে পারে। ইতিমধ্যে নওয়াজ শরিফের দল জোট সরকার গঠনের জন্য পিপিপি, জেইউআই-এফ এবং এমকিউএম-পির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। এমনকি ইমরান খান-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। তবে ইমরান খানের পিটিআইর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা পিএমএলএন বা পিপিপি কারো সঙ্গে জোট করবে না। অন্যদিকে পিপিপিও জানিয়েছে তারা পিএমএলএনের সঙ্গে জোটে যাবে না।
ফলাফল ঘোষণা নিয়ে ‘নাটক’:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার ভোট গণনায় অনেক বেশি ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যোগাযোগে গোলযোগের কারণে ভোট গণনায় দেরি হচ্ছে। ভোট গ্রহণের দিন নিñিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানে। কল ও ডেটা সেবা, কোনোটিই সচল ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল পরিষেবা বন্ধ থাকায় এখন নির্বাচনি ফলাফল আসতে দেরি হচ্ছে। পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করতে বলেছে। এদিকে, ইমরান খানের দল পিটিআই বলছে, ফলাফল ঘোষণায় এমন বিলম্ব ভোট কারচুপির লক্ষণ।
নির্বাচনের পরদিন পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পাওয়াটা অস্বাভাবিক না হলেও পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তার মাত্রা নজিরবিহীন বলছেন বিশ্লেষকরা। ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিসের তামান্না সালিকুদ্দিন বিবিসি নিউজডেকে বলেন যে, এই নির্বাচনের ফলাফল একপ্রকার ‘হয়ে যাওয়া চুক্তি’। তার মতে, এই চুক্তি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তার দল পিএমএলর বিজয়ের পথ অনেকটা পরিষ্কার করেছে। খুব কম আফিশিয়াল ফলাফল প্রকাশ হচ্ছে এবং ইসিপি তথ্য প্রকাশ করছে না। আমার মনে হয়, এটা অস্বাভাবিক। যারা এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় বিস্ময়। তিনি আরো বলেন যে, নির্বাচনে এখন পর্যন্ত যে ফলাফল আসছে, তাতে কোনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
এগিয়ে ইমরানের প্রার্থীরা:
পাকিস্তানের ১৬তম সাধারণ নির্বাচনের ভোট গণনা চলছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যাচ্ছে। তবে অনেকটা এগিয়ে আছে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এখন পর্যন্ত ৬২টি আসনে জয়ী হয়েছেন তারা। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের এবারের নির্বাচনে আশ্চর্যের বিষয় হলো সব ধরনের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।
জোট সরকার গঠনের চেষ্টায় নওয়াজ শরিফ:
পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশের আগেই পিএমএলএনকে একক বৃহত্তম বিজয়ী দল বলে দাবি করেছেন নওয়াজ শরিফ। গতকাল রাতে লাহোরে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, এই নির্বাচনে পিএমএলএন একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা আজ সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি এই আহত পাকিস্তানকে পুনর্গঠন করতে এবং আমাদের সঙ্গে বসতে। আমাদের এজেন্ডা শুধু একটি সুখী পাকিস্তান। তিনি বলেন, পাকিস্তান বর্তমানে যে সমস্যার মধ্যে রয়েছে তা থেকে বের করে আনতে সব রাজনৈতিক দলের একসঙ্গে বসে সরকার গঠন করা জরুরি। কারণ আমরা বারবার নির্বাচন করতে পারি না। এটা সবার পাকিস্তান, শুধু পিএমএলএনের নয়। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে বসতে হবে এবং পাকিস্তানকে সমস্যা থেকে বের করে আনতে হবে। নওয়াজ শরিফ বলেন, পিএমএল-এন জোট সরকার গঠনের জন্য পিপিপি, এমকিউএম-পি, জেইউআই-এফের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তিনি বলেন, আমরা লড়াই করতে চাই না। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি বিবেচনায় পাকিস্তানের অন্তত ১০ বছরের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
কে হবেন নতুন প্রধানমন্ত্রী?
এবারের নির্বাচনে ভোট কারচুপি হোক বা না হোক, সেনাবাহিনীর সুনজরে থাকার কারণে চতুর্থ বারের মতো নওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় বসতে পারেন। যদিও তার এমন উন্নতি কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। কারণ মাত্র ছয় বছর আগে, অর্থাৎ গত নির্বাচনের সময় দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তাকে। স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল তাকে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি নির্বাসন থেকে ফিরেছেন। গত বছর তার বিরুদ্ধে দেওয়া ক্ষমতায় আসতে আজীবন নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা হয়েছে। সরিয়ে ফেলা হয়েছে তার সব অপরাধের রেকর্ডও। সব মিলিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে তিনি আবারও নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আছেন পিপিপির বিলওয়াল ভুট্টো জারদারিও। অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা ৩৫ বছর বয়সি এই রাজনীতিক মূলত পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো এবং প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির ছেলে। বেনজির ভুট্টো ২০০৭ সালে পাকিস্তানের রাওয়ালপিণ্ডিতে ৫৪ বছর বয়সে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন। ২০২২ সালে ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন বিলওয়াল। তার দল এখন পর্যন্ত তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে যে রাজনীতিবিদ এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছেন, তিনি এমন একজন প্রার্থী যিনি আসলে ব্যালটেই নেই। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গত বছর থেকে কারাগারে থাকলেও ভোটের মাঠে এখনো তার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। গত সপ্তাহে তাকে আবার কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং তার দল পিটিআই সদস্যরা এবার বাধ্য হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ আসনে জয় পেয়েছেন পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্ররাই। পিটিআই প্রার্থীরা ‘ক্রিকেট ব্যাট’ প্রতীকের অধীনে নির্বাচন করতে পারবে না, নির্বাচন কমিশন এরকম একটা আইন জারি করায় এই প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধ্য হয়।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতলে কী হবে? তাত্ত্বিকভাবে, সংসদ সদস্যরা তাদের দলমত নির্বিশেষে সরকার গঠন করতে সক্ষম। পিটিআইর ক্ষেত্রে, তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা অন্য কোনো দলে যোগদান না করে তাদের সংসদীয় স্বাধীনতা বজায় রাখার পথ বেছে নিতে পারেন। আর যদি তারা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৩৪টি আসনে জয়ী হয়, তাহলে তারা সরকার গঠন করতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে ঐ সরকার হবে দুর্বল সরকার। যদিও এমনটা হলে রাজনৈতিক ভাগ্য খুলতে পারে ইরমান খানের। বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন সংখ্যার দিক বিবেচনায় সব দলই কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ফলে কোনো দলের এককভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন, সেটা দেখার জন্য দেশটির প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারকে অপেক্ষা করতে হবে।
