সরকারি খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে

আপলোড তারিখঃ 2024-01-31 ইং
সরকারি খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে ছবির ক্যাপশন:

সমীকরণ প্রতিবেদন:
দুর্নীতির ধারণা সূচকে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থানের আরো অবনমন হয়েছে। এটা প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবিক অর্থে কার্যকর প্রয়োগ হয়নি। সরকারি খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে। অর্থ পাচারের অনেক ঘটনা প্রকাশ হলেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি বলে টিআইবি বলছে। ২০২৩ সালের সিপিআই অনুযায়ী বাংলাদেশের স্কোর কমে ২৪ এবং অবস্থান দশম স্থানে রয়েছে। আর সর্বোচ্চ ৯০ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে আছে ডেনমার্ক। ৮৭ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ফিনল্যান্ড এবং ৮৫ স্কোর পেয়ে তৃতীয় স্থানে নিউজিল্যান্ড। আর ১১ স্কোর পেয়ে ২০২৩ সালে তালিকার সর্বনিম্নে অবস্থান করছে সোমালিয়া। নির্বাচনী গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্রগুলোর গড় স্কোর ৩১। সেখানেও বাংলাদেশের ২৪ স্কোর, উদ্বেগজনক ও বিব্রতকর।

জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণাসূচক প্রতিবেদন ২০২৩-এ এমন চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে গতকাল বার্লিনের সাথে একযোগে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মন্জুর-ই-আলমের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল ও উপদেষ্টা- নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ১৩ স্কোর পেয়ে নিম্নক্রম অনুযায়ী যৌথভাবে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও ভেনিজুয়েলা এবং ১৬ স্কোর পেয়ে তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে ইয়েমেন। সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, সিপিআই-এ অন্তর্ভুক্ত ১৮০টির মধ্যে ১০৫টি দেশ বৈশি^ক গড় ৪৩-এর কম স্কোর করেছে। অর্থাৎ বিশে^র ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই গড় স্কোর ৪৩-এর চেয়ে কম পেয়ে সূচকের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী অতীব উদ্বেগজনক দুর্নীতির মধ্যে বাস করছে। আর সূচকে অন্তর্ভুক্ত দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি- ১২২টি দেশের স্কোর ৫০ এর নিচে, যার অর্থ এসব দেশে দুর্নীতির মাত্রা উদ্বেগজনক।

২০২৩ সালের সিপিআই অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে ভুটান গত বছরের ৬৮ স্কোর ধরে রাখলেও, এ অঞ্চলের পাঁচটি দেশ এবার ২০২২-এর তুলনায় কম স্কোর করেছে আর অবশিষ্ট দুটি দেশের স্কোর কিছুটা বেড়েছে। এর মধ্যে আফগানিস্তানের ৪ পয়েন্ট, শ্রীলঙ্কার ২ পয়েন্ট এবং বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও ভারতের স্কোর ১ পয়েন্ট করে কমেছে। আর পাকিস্তানের ২ পয়েন্ট এবং নেপালের ১ পয়েন্ট স্কোর বেড়েছে। তবে, দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র ভুটান ছাড়া বাকি সাতটি দেশই সূচকের গড় স্কোর ৪৩-এর কম পেয়েছে। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার জনসাধারণ সার্বিকভাবে অতীব উদ্বেগজনক দুর্নীতির মধ্যে জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৩-এ বাংলাদেশের স্কোর ২০২২-এর তুলনায় ০-১০০ স্কেলে এক পয়েন্ট কমে ২৪ এবং নিম্নক্রম ও ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী অবস্থানের দুই ধাপ অবনতি হয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে যথাক্রমে ১০ম ও ১৪৯তম। স্কোর ও অবস্থানের এই অবনমন প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণাসহ সরকারের বিভিন্ন অঙ্গীকার- সূচকের তথ্যের সময়কালে (নভেম্বর ২০২০- সেপ্টেম্বর ২০২৩) বাস্তবিক অর্থে কোনো কার্যকর প্রয়োগ হয়নি। বরং আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় বাংলাদেশের অবস্থানের আরো অবনতি হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকরভাবে সব ধরনের দুর্নীতির অপরাধের শাস্তি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পাঁচ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, সিপিআই অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্কোর ২০২২ সাল পর্যন্ত ২৫ থেকে ২৮ এর মধ্যে আবর্তিত ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে বাংলাদেশ গত বছরের তুলনায় আরো এক পয়েন্ট কমে এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন ২৪ স্কোর। নিম্নক্রম ও ঊর্ধ্বক্রম উভয় দিক থেকেই দুই ধাপ অবনমন হয়ে যথাক্রমে ১০ম ও ১৪৯তম অবস্থানে রয়েছে। টিআই কর্তৃক ২০১২ থেকে ২০২৩ মেয়াদের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশের এ বারের স্কোর সার্বিক ১২ বছরের গড় স্কোর ২৬-এর তুলনায় ২ পয়েন্ট কম এবং এই মেয়াদে সর্বনিম্ন।

এ বছর সিপিআই-এর প্রতিপাদ্য ‘দুর্নীতি ও অবিচার’ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ড. জামান বলেন, সিপিআই-এ প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায় যে, ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গবেষণা অনুযায়ী ২৪টি পূর্ণ গণতান্ত্রিক, ৪৮টি ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক, ৩৬টি হাইব্রিড গণতান্ত্রিক ও ৫৯টি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের গড় সিপিআই স্কোর যথাক্রমে ৭৩, ৪৮, ৩৬ ও ২৯। অথচ বাংলাদেশের স্কোর ২৪। এমনকি ফ্রিডম হাউজ অনুযায়ী যেসব দেশে নির্বাচনী গণতন্ত্র আছে এমন ৯৩টি রাষ্ট্রের গড় স্কোর ৫৩। তিনি বলেন, দুর্নীতি ও অবিচার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। দুর্নীতি অন্যায়ের জন্ম দেয় এবং অন্যায় দুর্নীতির দুষ্টচক্র তৈরি করে। সিপিআই-এর তথ্য আরো প্রমাণ করে, যেসব দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা রয়েছে, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত, সেসব দেশের কার্যকর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশের নিম্ন অবস্থানের ব্যাখ্যা তুলে ধরে ড. জামান বলেন, গত কয়েক বছর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ঘোষিত ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা’র সবচেয়ে আলোচিত মেয়াদ ছিল। কিন্তু এই মেয়াদে এই ঘোষণাকে চর্চায় রূপ দেয়ার সুনির্দিষ্ট কৌশল-নির্ভর কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। উপরন্তু এই মেয়াদে দুর্নীতির ব্যাপকতা ঘনীভূত ও বিস্তৃত হয়েছে। সরকারি ক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে দুর্নীতির অসংখ্য তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই সময়কালে বিদেশে অর্থ পাচারের আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে আসলেও এর প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। ঋণখেলাপি, জালিয়াতি ও অর্থপাচারে জর্জরিত ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং এর জন্য যারা দায়ী তাদের জন্য বিচারহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমনে কার্যকর দৃষ্টান্ত শাস্তি নিশ্চিতে কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিকসহ বিভিন্নভাবে অর্জিত ক্ষমতার অবস্থানকে অপব্যবহারের মাধ্যমে সম্পদ বিকাশের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়ে স্বাভাবিকতায় রূপান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব ব্যাপকতর হয়েছে। দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের ভালো হওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, সরকারের দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকার আছে। তারা যে কথাগুলো বলে, সেগুলা সৎভাবে বলেন কি না তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে। তবে তারা যেই মন্তব্য করেন, আমাদের হতাশ হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)