ছবির ক্যাপশন:
আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
শিক্ষা কর্মকর্তাদের সহায়তায় জাল ভাউচারের মাধ্যমে ঝিনাইদহে পারফরমেন্স বেজড গ্রান্ডস ফর সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনস (পিবিজিএসআই) স্কিমের কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কিমের খাতভিত্তিক খরচ না করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে টাকা তুলে নিয়েছে। এই স্কিমের আওতায় প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ঝিনাইদহের ৬ উপজেলার ১০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে ৫০ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়।
পারফরমেন্স বেজড গ্রান্ডস ফর সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনস স্কিমের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথম ধাপে ঝিনাইদহ জেলার ৫৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ টাকা করে মোট ২৭ কোটি ৫ লাখ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই নিয়মে ২৩ কোটি ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। স্কিম পরিচালক চিত্তরঞ্জন দেবনাথ স্বাক্ষরিত এক পত্রে বলা হয়, নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহে জবাবদিহি অনুদান হিসেবে এসব অর্থ ৫টি খাতে ব্যয় করতে বলা হয়। প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ টাকা সরাসরি পাঠিয়ে দফাওয়ারি খাতে ব্যয় করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। ৫টি খাতের মধ্যে ছিল শিক্ষক প্রণোদনা হিসেবে এক লাখ টাকা, বইপত্র, লাইব্রেরি, শিক্ষা উপকরণ ও গবেষণা সরঞ্জাম হিসেবে দেড় লাখ টাকা, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক পৃথক শৌচাগার, নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণ ও ছাত্রী কমনরুমের উন্নয়নে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যয় ৭৫ হাজার টাকা এবং সরকার কর্তৃক স্বীকৃত প্রতিবন্ধিতার মাত্রা অনুযায়ী অগ্রাধিকার চাহিদা সম্পন্ন প্রতিবন্ধীকে ৫০ টাকা সহায়তা দিতে বলা হয়।
এরমধ্যে বইপত্র, লাইব্রেরি, শিক্ষা উপকরণ ও গবেষণা সরঞ্জাম ক্রয় করতে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করতে বলা হয়। কিন্তু উল্লেখিত খাত বহির্ভূত পুরাতন প্রকাশনার বই কেনার অভিযোগ রয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটির কথা বলা হলেও তা করা হয়নি। খাত ওয়ারি এসব টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে পটেকস্থ করা হয়েছে।
হরিণাকুণ্ডুর সোনাতনপুর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দীন জানান, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের টাকা বণ্টন করতে আসলে উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে এই খাত থেকে যাতায়াত খরচ ও সম্মানি দিতে হয়েছে। এদিকে সোনাতনপুর হাই স্কুলের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, তার সাক্ষর জাল করে প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দীন পিবিজিএসআই স্কিমের দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। গবেষণা সরঞ্জামাদি কেনার নামে দুটি ল্যাপটপের ডিসপ্লে কেনা দেখিয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যয় ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে নিজের চিকিৎসা করিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রধান শিক্ষক জানান, পিবিজিএসআই স্কিমের টাকা স্কুল ফান্ডে আসার ১৫ দিনের মধ্যে উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা জোর করে ভাউচার নিয়ে নেন। প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে। সরজমিন সদর উপজেলার হরিশংকরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় তাদের লাইব্রেরিতে পুরাতন বই ও আসবাবপত্র দেখিয়ে ভুয়া ভাউচার করা হয়েছে। একই ভাবে হাটগোপালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও ভুয়া ভাউচারে টাকা লোপাট করার অভিযোগ উঠেছে। মহেশপুরের খালিশপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পিবিজিএসআই স্কিমের টাকা দিয়ে ভবন রং করা হয়েছে। অথচ ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের পৃথক কমনরুম ও শৌচাগার নেই। মহেশপুরের মালাধরপুর মাদ্রাসায় পিবিজিএসআই স্কিমের টাকা দিয়ে সুপারের ব্যক্তিগত শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ওই মাদ্রাসায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী না থাকা সত্ত্বেও হুইলচেয়ার কেনা হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যয় ৭৫ হাজার টাকা সভাপতি ও সুপার ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।
মহেশপুরের বাকসপোতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লাইব্রেরির বই কেনা এবং ছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক পৃথক শৌচাগার, নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণ ও ছাত্রী কমনরুমের উন্নয়নে দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ। এদিকে কালীগঞ্জ ও শৈলকুপা উপজেলার বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পিবিজিএসআই স্কিমের টাকার কোনো হদিস নেই।
কালীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন জানান, এ বিষয়ে দ্বিতীয় ধাপের বরাদ্দের কোনো চিঠি পাননি। অথচ এই টাকা ২০২৩ সালের জুলাই মাস থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার কামরুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে জেলা শিক্ষা অফিসার মনিরুল ইসলাম জানান, পিবিজিএসআই স্কিমের টাকা যদি কেউ খাতভিত্তিক ব্যয় না করে থাকে তবে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
