ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বাজেটের আগে আগামী মে মাসে আরেক দফা বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। ইতোমধ্যে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। লোকসানের হাত থেকে বাঁচতে বিতরণ সংস্থাগুলোও ভোক্তা পর্যায়ে ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির জন্য পিডিবির কাছে আবেদন করেছে। সে ভিত্তিতেই ধাপে ধাপে ১৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। এছাড়া ডলার সংকট, ভর্তুকি সমন্বয় করতে না পারাসহ আইএমএফের ঋণের বিপরীতে শর্ত পালনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে এ দফায় বিদ্যুতের দাম আরও ৫ শতাংশ আসছে মাসে বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণপ্রাপ্তির শর্তানুযায়ী আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তুকি কমিয়ে আনতে হবে। সরকার বিষয়ে ইতোমধ্যে নানামুখী উদ্যোগ নিলেও ভর্তুকির পরিমাণ শর্তের তুলনায় বেশি, যা আগামী অর্থবছরের বাজেটে সমন্বয় করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র মতে, এ সংক্রান্তসহ অন্যান্য বিষয়ে গতকাল বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইএমএফ মিশন টিমের বৈঠক হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে আইএমএফ মিশনের সঙ্গে বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে এ কথা জানানো হয়। আইএমএফের শর্ত অনুসারে ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানির প্রাইসিং ফর্মুলা করবে সরকার। এ ফর্মুলায় ভর্তুকি হবে শূন্য। এ নিয়ে বর্তমানে কাজ করছে জ্বালানি বিভাগ। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন। অন্যদিকে মিশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যান্টেলা, সেভাকো, রিচার্ড জোনাথন, নিকি জিনেট। কার্যত মিশনের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। সেখান থেকে ফিরে পরবর্তী বৈঠকে যোগ দেবেন।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ভর্তুকি কমাতেই নেয়া হচ্ছে এমন সিদ্ধান্ত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা কমেছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগে ২৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এ বছর সে বরাদ্দ নেমে এসেছে ২৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা কম। চলতি বছরের ১০ই জানুয়ারি বিশেষ প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, তেল ও গ্যাসের দাম নির্ধারণ, পুনঃনির্ধারণ এবং সমন্বয়ে সরাসরি সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ রেখে 'বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০২৩- এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এর আগে আইন সংশোধন করে গত ১লা ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন), অধ্যাদেশ, ২০২২’ গেজেট আকাওে প্রকাশ করে সরকার। এর মধ্যদিয়ে বিশেষ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সরাসরি বাড়ানো বা কমানোর ক্ষমতা যায় সরকারের হাতে।
জানা গেছে, আইএমএফ গত ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর তিনদিন পরই প্রথম কিস্তিতে ছাড় করা হয় ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে ৭টি কিস্তিতে বাংলাদেশকে ঋণের পুরো অর্থ দেবে আইএমএফ। আইএমএফ সাধারণত ঋণের প্রতিটি কিস্তি দেয়ার আগে শর্ত পরিপালনের নানা দিক নিয়ে পর্যালোচনা করে থাকে। সে অনুযায়ী দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে ঋণের শর্তপূরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করতে আইএমএফের একটি দল এখন বাংলাদেশে সফর করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠক করছে সফরকারী প্রতিনিধি দল। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সঙ্গে ও গতকাল এনবিআরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।
সূত্র মতে, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানান, আইএমএফের শর্ত পরিপালনের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো খাতগুলোতে সরকারি ব্যয় বাড়াতে সার ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করে ভর্তুকি কমানোর জন্য অনেকগুলো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সামগ্রিক ভর্তুকি আইএমএফ নির্ধারিত সীমায় আটকে রাখতেই সরকার ইতোমধ্যে সারের দাম বাড়িয়েছে। বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়। জ্বালানি তেলের মূল্য আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই তিন মাস পরপর আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এর আগে গত ২১শে নভেম্বর বিদ্যুতের পাইকারি দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি করে বিইআরসি। এরপরই গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ২০ শতাংশ বৃদ্ধির আবেদন করে বিতরণ কোম্পানিগুলো। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ই জানুয়ারি গণশুনানি করে বিইআরসি। কিন্তু গণশুনানি শেষে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাহী আদেশে বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে কয়েক দফায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে সরকার। সে প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই আরেক দফা বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হবে। যার ঘোষণা আসতে পারে আসছে মে মাসে। এর আগে গত জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুতের মূল্য তিন দফায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। সর্বশেষ ২৮শে ফেব্রুয়ারি ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়।
এ প্রসঙ্গে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে তাতে খুচরাও বাড়বে। লোকসানের হাত থেকে বাঁচতে বিতরণ সংস্থাগুলোও ভোক্তা পর্যায়ে ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির জন্য পিডিবির কাছে আবেদন করেছে। সে ভিত্তিতেই ধাপে ধাপে ১৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। রমজানে যাতে মানুষ মনে আঘাত না পায় এজন্য সরকার সচেষ্ট বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি ধারণা দিয়ে বলেন, আগামী মাসে বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়ানো হতে পারে। এর ফলে জনজীবনে চাপ বাড়ছে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু গ্রাহকরা একটু সাশ্রয়ী হলেই এই মূল্যবৃদ্ধির চাপটা সামলাতে পারবে। বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সে ভর্তুকির পরিমাণ এখন দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। সরকার তো বর্তমানে এত পরিমাণ ভর্তুকি দেয়ার মতো প্রস্তুত নয়।
জানা গেছে, গত ১৪ বছরে পাইকারি পর্যায়ে ১১ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। আগে গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করতো এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আইন সংশোধন করে এ ক্ষমতা হাতে নিয়েছে সরকার। এরপর থেকে নির্বাহী আদেশে দাম বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। দেশের সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। এরপর তারা উৎপাদন খরচের চেয়ে কিছুটা কম দামে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। ঘাটতি মেটাতে পিডিবি সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নেয়। তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকি পায় না। তারা নিয়মিত মুনাফা করছে। গত অর্থবছরেও মুনাফা করেছে বিতরণ সংস্থাগুলো।
শর্তের অগ্রগতি জানতে চায় আইএমএফ :
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফের কাছ থেকে দ্বিতীয় কিস্তির ঋণ পেতে মানতে হবে কিছু শর্ত। একইসঙ্গে আগামী জুনে প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নতুন বাজেটেও কিছু প্রতিশ্রুতি বা শর্ত থাকার কথা রয়েছে। এসব শর্তের অগ্রগতি কতটুকু হলো, তা জানতে ঢাকায় সফররত আইএমএফের প্রতিনিধি দলটি। মঙ্গলবার ঢাকায় পৌছেই আইএমএফ'র এই দলটি তিন ভাগে ভাগ হয়ে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে। সফরের প্রথম দিনের প্রথমার্ধে সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের কর্মকর্তা এবং দুপুরে সার্বিক অর্থনীতি পরিস্থিতি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ফাতিমা ইয়াসমিনের সঙ্গে বৈঠক করেছে প্রতিনিধি দলের এক অংশ। অপর অংশটি বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে।
জানা গেছে, গতকাল এই দুটি টিমই আবারও বিভক্ত হয়ে সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের সঙ্গে বৈঠক করেছে। আইএমএফ-এর ঋণ চুক্তিতে প্রায় ৩৮টি শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে আগামী জুন ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে যেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে, এবারের সফরে সেগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি যাচাই করবে আইএমএফ টিম। এই ঋণের বাকি কিস্তির অর্থ পেতে আগামী ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে যেসব শর্ত বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে সরকার, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য আগামী বাজেটে কী কী উদ্যোগ থাকছে, তাও এবার পর্যালোচনা করবে ঢকায় সফররত আইএমএফের দলটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক জানিয়েছেন, আইএমএফের ‘স্টাফ ভিজিট’ একটি নিয়মিত কাজ। আইএমএফ সদস্য সব রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আলোকে সংস্কার নিয়ে নিয়মিত তদারকি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আজকের বৈঠকে অর্থনৈতিক সূচকগুলোর হালনাগাদ তথ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে । অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে, তা আমরা টিমকে জানিয়েছি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের (আইএমএফ দল) বলা হয়েছে যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর আদায়ে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দিয়েছে। এনবিআর আশা করছে, নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে। এরপরও এ খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলেছে আইএমএফ।
