ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন:
চাহিদার চেয়ে দেশে এখন বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বেশি। বর্তমানে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। কিন্তু উৎপাদন ক্ষমতা কমবেশি ১৯ হাজার ৫৩৬ মেগাওয়াট। গত ২০ মার্চ দেশ শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনার ঘোষণা দেয়া হয়। গ্রাহক চাহিদার চেয়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বেশি উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও প্রতিদিন লোডশেডিং ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে কোটি কোটি গ্রাহককে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত একই চিত্র। সর্বোত্রই লোডশেডিং। মফস্বলের প্রত্যেকটা শহর ও গ্রামে প্রতিদিন লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ চলে গেছে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। গত এক যুগে রেন্টাল কুইক রেন্টালের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হলেও গ্রাহক পর্যায়ে সুফল মিলছে না।
জানা গেছে, গত এক যুগে দেশে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সারাদেশে গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ২১ লক্ষ। মোট সঞ্চালন লাইন (সা.কি.মি.) ১৩,২১৩, গ্রিড সাব-স্টেশন ক্ষমতা (এমভিএ): ৫৫,৩০৭, বিতরণ লাইন (কি.মি.): ৬ লক্ষ ২১ হাজার। সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রর ৫৫টির উৎপাদন ক্ষমতা ১০৭৫৮ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। বে-সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে ৭৮টির উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ৮৭৭৮ দশমিক ২৫৯ মেগাওয়াট। এছাড়া ভারত থেকে আমদানী করা হচ্ছে ১১৬০ মেগাওয়াট। তারপরও রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন কয়েকবার করে বিদ্যুতের লোডশেডিং হচ্ছে। চৈত্রের রোদ তেঁতে উঠেছে। এর মধ্যে লোডশেডিংয়ের নামে চলছে বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে হয় গ্রামের কোটি কোটি মানুষকে। প্রতিদিন প্রায় তিন ঘণ্টা বেশ কয়েকটি সঞ্চালন লাইন বন্ধ থাকছে। সন্ধ্যায়ও একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ থাকছে না। গ্রামের সাধারণ মানুষের অভিযোগ, একটু বাতাস কিংবা বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ বিভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া যায় না। আবার সংযোগ দিলেও এক ঘণ্টা পরপর বিচ্ছিন্ন করে দেয়। চলতি গ্রীষ্মকালে পিক আওয়ারে ১৫,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা হতে পারে এবং গ্যাসের সম্ভাব্য চাহিদা ১৫০০ এমএমসিএফডি হতে পারে। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে দায়ি করছে পল্লী বিদ্যুতের একাধিক কর্মকর্তা।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, গত সোমবার কুড়িগ্রামে ঝড়ো হাওয়ার কারণে সঞ্চালন লাইন বন্ধ করে দেয়া হয়। বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কায় এই পদক্ষেপ নেয়া হয়। তবে সারাদেশে বেশ কয়েকটি সঞ্চালন লাইনের মধ্যে কিছু চালু করা হয়েছে। একটি লাইনের ওপর গাছ পড়ায় সেটি সন্ধ্যার আগে চালু করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। সারাদেশের চৈত্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে দেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়েছে। সরকারের হিসেব বলছে, চাহিদার তুলনায় অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা বেশি। এরপরও জিরো লোডশেডিং আওয়ার বা শূন্য লোডশেডিং এ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। গ্রীষ্ম এবং সেচ মিলিয়ে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা থাকে এপ্রিলে। মে থেকেই বৃষ্টির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কমতে থাকে। জুনের পর কিছুটা চাহিদা বাড়লেও বেশি জুলাই এবং আগস্টে এসে আবার কমতে শুরু করে। দেশে সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রর ৫৫টি যার উৎপাদন ক্ষমতা ১০৭৫৮ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। বে-সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে ৭৮টি এতে উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ৮৭৭৮ দশমিক ২৫৯ মেগাওয়াট। এছাড়া ভারত থেকে আমদানী করা হচ্ছে ১১৬০ মেগাওয়াট।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে আসন্ন রমজান ও চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিদ্যুতের চাহিদা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ নিয়ে নাতিদীর্ঘ পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন। চলতি গ্রীষ্মকালে পিক আওয়ারে ১৫,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা হতে পারে এবং গ্যাসের সম্ভাব্য চাহিদা ১৫০০ এমএমসিএফডি হতে পারে।
বিদ্যুৎ সচিব মো. হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আসন্ন রমজান মাসে ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রসমূহে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত, বৃদ্ধিকরণ, পিক আওয়ারে (সান্ধ্যকালীন) চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ইফতার, তারাবীর নামাজ ও সেহরির সময়ে লোডশেডিং না করা, টেকনিক্যাল কারণে বা অন্য কোনো কারণে যেন লোডশেডিং না হয় সে দিকে সজাগ থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়।
সুত্র জানায়, এপ্রিল মাসে মোট বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়াবে ১৫ হাজার ৭৬৬ মেগাওয়াট। যা গত বছর ছিল ১৪ হাজার ৭৩৫ মেগাওয়াট। এরমধ্যে ঢাকার চাহিদা ছিল ৫ হাজার ৯০৩, আর এবার হবে ৬ হাজার ৩১৬, একইভাবে চট্টগ্রামে চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪৫৬, এবার ১ হাজার ৫৫৮, ময়মনসিংহে ছিল ৭২২, এবার ৭৭৩, সিলেটে ছিল ৫৭৪, এবার ৬১৪, কুমিল্লায় ছিল ১ হাজার ৩২৭, এবার ১ হাজার ৪২০, খুলনায় ছিল ১ হাজার ৭৬০, এবার ১ হাজার ৮৮৩, বরিশালে ছিল ২৯৩, এবার ৩১৪, রাজশাহীতে ছিল ১ হাজার ৭৫৪, এবার ১ হাজার ৮৭৬, রংপুরে ছিল ৯৪৬, এবার ১ হাজার ১২ মেগাওয়াট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৭ মার্চ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৩৬৯ মেগাওয়াট। রোদের তীব্রতা বাড়লে চাহিদা বেড়ে হবে ১৫ হাজার ৭৬৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদা আরো ২ হাজার ৩৯৭ মেগাওয়াট বেড়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূল সঙ্কট জ্বালানি। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ২ হাজার ২৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু এখন সরবরাহ করা হচ্ছে এর অর্ধেক ১ হাজার ১১৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর চাইতে বেশি গ্যাস সরবরাহ করা বেশ কঠিন বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হয়। গ্রীষ্মে চাহিদা বেড়ে গেলে বেশি মাত্রায় জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে গ্রীষ্মে অতিরিক্ত চাহিদা প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট সৃষ্টি হলে তা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এই দুই কারণ ছাড়াও বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে গ্রীষ্মে লোডশেডিং করতে হয়। শহরাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ করা হলেও গ্রামীণ জনপদে এই সময় লোড ম্যানেজমেন্ট করা হয়। এবারও সেই উদ্যোগ আগেভাগেই নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ গ্রীষ্ম এবং সেচকে সামনে রেখে যে পুস্তিকা প্রকাশ করেছে তাতে বলা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে অনুরূপ লোড ম্যানেজমেন্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান পরিস্থিতিতে লোডশেডিং হবে না বলে আশা করা যায়। হলেও তা সহনীয় পর্যায়ে রাখার ব্যবস্থা নেয়া হবে। অর্থাৎ এবারও লোডশেডিং হবে না এই কথা জোর দিয়ে বলতে পারছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। বিভাগের পুস্তিকা বলছে লোডশেডিং হবে। কিন্তু তা থাকবে সহনীয় মাত্রায়।
