জিম্মি করেই ভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা

আপলোড তারিখঃ 2021-11-07 ইং
জিম্মি করেই ভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা ছবির ক্যাপশন:
নিত্যপণ্যেই নাভিশ্বাস, এরই মধ্যে বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। ক্রয়ক্ষমতা বাড়ুক বা না-ই বাড়ুক তা নিয়ে যেন সরকারের মাথাব্যথা নেই। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতেও সরকারের মাথাব্যথা দেখা যায়নি, দেখা যাচ্ছে না জ্বালানি তেল কেরোসিন-ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও। এদিকে সরকারের এমন দায়হীন ভাবের প্রভাব গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ঠেকেছে জনজীবন। কৃষি ক্ষেত্রেও উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের বাজারে আরও এক দাপ বাড়তি মাত্রা পাচ্ছে আগুন। যে আগুনে জ্বলছে জীবন। গতকাল থেকে সারা দেশে মাত্রাহীন ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। চাকরিজীবী-চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন বেসকারি অফিসগামী মানুষজনের মাত্রাহীন ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে সড়ক-মহাসড়কে। কিন্তু তাতেও যেন কিছুই যায় আসে না পরিবহন মালিক-শ্রমিক কিংবা সরকারের। মালিক-শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের মধ্যে মানুষের ভোগান্তি নিয়ে চিন্তার লেশমাত্র নেই। নেই সরকারেরও। গতকাল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে মালিক-শ্রমিক নেতারা সাক্ষাত করলেও সৃষ্ট জটিলতার সমাধান হয়নি, বরং সাক্ষাত শেষে নেতারা ফের ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ধর্মঘটেও সিএনজিচালিত পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা গাড়ি রাস্তায় নামাতে চাইলে তাদেরও বাধ্য করা হচ্ছে ধর্মঘটে অংশ নিতে। আবার ধর্মঘটে গতকাল থেকে অংশ নিয়েছেন লঞ্চ মালিকরাও। এ যেন সাধারণ মানুষকে জিম্মি করেই ভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারায় মেতে উঠেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরাও বলছেন, এভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা ঠিক হচ্ছে না। যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতিও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ইস্যুতে পরিবহন ধর্মঘটের নামে পরিবহন খাতে নেতৃত্বদানকারী সংগঠনগুলো দেশের মানুষকে জিম্মি করছে বলে অভিযোগ করেছে। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দেশে পরিবহন খাতে নৈরাজ্য আরও বাড়বে। তিনি পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় দাবি আদায়ের জন্য পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি জানান, নিবন্ধিত সংগঠনগুলোর আন্দোলন ও দাবি আদায়ের নিয়মনীতি থাকলেও পরিবহন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো কথায় কথায় ধর্মঘট করছে। তিনি পরিবহন সংগঠনগুলোর নেতাদের প্রশ্ন করে বলেন, দেশের মানুষকে জিম্মি করে পরিবহন ধর্মঘট কেন? গত দুই দিনে পরিবহন ধর্মঘটের কারণে হাজারো যাত্রীকে নানা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, এ ধর্মঘটের মাধ্যমে পরিবহন মালিকরা জনগণকে জিম্মি করে তাদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে নেবে। তিনি আরও জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে জনগণকে আরেক দফা সংকটে ঠেলে দেয়া হয়েছে। ছয় লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে জ্বালানি খাতে মূল্য না বাড়িয়েও ছয় হাজার কোটি টাকা বছরে ভর্তুকি দেয়ার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। তিনি অনতিবিলম্বে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করে পরিবহন ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্য বন্ধের দাবি জানান। এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি, সমন্বয় করা হয়েছে। ভারতসহ বিশ্ব বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং পাচার ঠেকাতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম যে হারে সমন্বয় করা হয়েছে, তাতে গণপরিবহনে ১০ কিলোমিটারে যাত্রী প্রতি ভাড়া ৯৩ পয়সার বেশি বাড়ার কথা না। ভাড়া বাড়ানোর নামে যাত্রীদের এভাবে জিম্মি করা উচিত হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে দাম কমলে আমরাও আবার দাম কমিয়ে দেবো। দাম সমন্বয় না করলে, জ্বালানি তেল পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কথায়ও যেন চিড়া ভিজবে না অবস্থা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গেও এ ইস্যুতে সাক্ষাত শেষে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ট্রাক শ্রমিক-মালিক ফেডারেশন। ফেডারেশনের অতিরিক্ত মহাসচিব আবদুল মোতালেব বলেন, হয় বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করতে হবে, না হয় ভাড়া বাড়াতে হবে। দুটির একটি না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফ মাহমুদ অপু বলেন, দু’-একজন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে গেছেন। তবে এটি কোনো বৈঠক নয়। ডিজেলের দাম বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়ায় লঞ্চ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন মালিকরা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল সংস্থার সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদল এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আমরা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সরকার এতে সাড়া দেয়নি। কথা ছিলো দুপুরের মধ্যে আমাদের ডেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। মালিকরা বলছেন, লস দিয়ে তারা আর লঞ্চ চালাবেন না। ইতোমধ্যে সদরঘাটের টার্মিনাল থেকে সব লঞ্চ সরিয়েও নেয়া হয়েছে। তবে লঞ্চ মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে আজ বিকেল নাগাদ বৈঠকে বসার কথা রয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে গতকাল সারা দেশে বেসরকারি বাস, মিনিবাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বাস বন্ধ হলেও সিএনজিচালিত বাস মালিকরা কেন ধমর্ঘট পালন করছেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ যাত্রীরা। কেউ কেউ বলছেন, মালিক সমিতির নেতারা তাদের বাধ্য করছেন ধর্মঘটে অংশ নিতে। গতকাল সন্ধ্যায় জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল বন্দরে কোনো কন্টেইনার আনা নেয়া করা যায়নি। যে কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে; কন্টেইনার জট তৈরির শঙ্কাও দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। এ ছাড়া বেনাপোল স্থলবন্দরেও সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বন্দরটি। ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য নিয়ে অন্তত ৪০০ ট্রাক রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে বলে জানিয়েছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া হঠাৎ করে গণপরিবহন ও দূরপাল্লার বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর্যটন শহর কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে প্রায় ২০ হাজার পর্যটক আটকা পড়েছেন বলে আমার সংবাদকে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, বেশির ভাগই নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ফিরছেন, যারা ফিরতে পারছিলেন না তাদের বাংলাদেশ পুলিশের গাড়িতে করে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ বিমানেও ফিরছেন বলে জানান তিনি। তবে এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোও বাড়তি টাকা নেয়ার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, ধর্মগট ইস্যুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সভা শুরুর ৪০ মিনিট আগেই তা অনিবার্য কারণ দেখিয়ে স্থগিত করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফ মাহমুদ অপু বলেন, পরে যখন সভা হবে, তা সময়মতো জানিয়ে দেয়া হবে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)