ছবির ক্যাপশন:
ধরিত্রী বাঁচানো তথা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমিয়ে আনা আর ভুক্তভোগী দেশগুলোর জন্য জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুতি আদায়ের বড় প্রত্যাশা নিয়ে রোববার স্কটল্যান্ডের গ্ল্যাসগোতে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন। এই সম্মেলনে যোগ দিতে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারের প্রতিনিধিরা গ্লাসগোতে জড়ো হয়েছেন প্রত্যাশা পূরণের চাপ নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে, শেষ পর্যন্ত তা কতটা পূরণ হবে? সংবাদসূত্র : ডিডাব্লিউ নিউজ, ডিপিএ, বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নত, উত্তর গোলার্ধ্ব থেকে শুরু করে দক্ষিণ; জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কারও একার মাথা ব্যথার বিষয় নয়। যে দেশগুলো এতদিন নিজেদের নির্ভার মনে করেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধির আঁচ তারাও টের পেতে শুরু করেছে। চলতি বছরই অস্বাভাবিক দাবানলে পুড়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও তুরস্ক। অভূতপূর্ব বন্যা দেখা দিয়েছে চীন ও জার্মানিতে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো নিচু এলাকার দেশগুলো দায়ী না হয়েও আগে থেকেই জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগী। ঠিক এমন বাস্তবতায় গস্নাসগোতে রোববার থেকে শুরু হলো জাতিসংঘের ২৬তম জলবায়ু সম্মেলন; যা ‘কপ-২৬’ নামে বেশি পরিচিত, চলবে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত। ছয় বছর আগে করা প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে আগামী দেড় সপ্তাহ বৈশ্বিক নেতাদের দেনদরবার, তর্ক-বিতর্ক চলবে সেখানে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অচলাবস্থা ঘোচাতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর বড় চাপ থাকবে এবারের সম্মেলনে। এ নিয়ে কূটনৈতিক মতপার্থক্যের সময় আগেই পার হয়ে গেছে বলে মনে করেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। সম্মেলন শুরুর আগে করা টুইটে তিনি উলেস্নখ করেন, বিশেষ করে জি-২০ নেতারা জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তৈরি অচলাবস্থা কাটানোর নেতৃত্ব না দিলে ভয়ংকর ভোগান্তির মুখোমুখি হবে মানব সম্প্রদায়।
রোববার শুরু হওয়া এই জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, রাষ্ট্রপ্রধান ও বিভিন্ন সংস্থার ২৫ হাজারের বেশি সদস্যের অংশগ্রহণে এই সম্মেলন শুরু হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তারা কীভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাবেন এবং পৃথিবী নামক গ্রহকে সাহায্য করবেন, তার ঘোষণা দেবেন। রোববার মূলত সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী ছিল। তাই এদিন খুব বেশি আলোচনা হয়নি। মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কারণে কারণে নির্গত গ্রিন হাউস গ্যাসে বিশ্ব ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে, সে কারণেই বিজ্ঞানীরা জলবায়ু সংক্রান্ত ভয়াবহ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ চাইছেন। না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, এই সম্মেলন বিশ্বের জন্য 'খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রম্নত সিদ্ধান্ত' নেওয়ার ?মুহূর্ত। দুই সপ্তাহের এই সম্মেলনের প্রাক্কালে নেতাদের তা সফল করার তাগিদ দিয়ে বরিস বলেন, 'আমরা এই মুহূর্তকে কাজে লাগাতে পারব, নাকি ফসকে যেতে দেব, প্রত্যেকেই সে প্রশ্ন করছে।' কপ-২৬ সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা বলেছেন, 'প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে আমরা যা অর্জন করেছিলাম, এবার তেমন চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হবে। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বের দেশগুলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করার লক্ষ্যমাত্রা নিতে একমত হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন দুই দশমিক সাত ডিগ্রি সেলসিয়াসের পথে আছে, যা জলবায়ু বিপর্যয় ঘটাতে পারে।'
অলোক শর্মা বলেন, 'তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখাটা এখন নেতাদের ওপর নির্ভর করছে। তাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন এবং তাপমাত্রা এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার ওই লক্ষ্য আমরা কীভাবে পূরণ করবো, সে ব্যাপারে আমাদের একযোগে একমত হওয়া দরকার।' তিনি আরও বলেন, 'বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী চীনের মতো দেশগুলোর কাছ থেকে আমরা আরও বেশি কিছু আশা করি এবং এই জলবায়ু সম্মেলন এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য নেতৃত্ব দেখানোর সত্যিকারের একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে।'
সম্মেলনের প্রথম দিনই বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডাব্লিউএমও) প্রকাশিত জলবায়ু পরিস্থিতি-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দেখানো হয়। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের তৈরি ডবিস্নউএমও'র এই সাময়িক প্রতিবেদনে চলতি বছরের বৈশ্বিক তাপমাত্রার সঙ্গে আগের বছরগুলোর তাপমাত্রার তুলনা করা হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে চলায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মীদের আন্দোলনের কারণে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এরপরও বিজ্ঞানীরা গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমণের জন্য অর্ধশত বছর ধরে যে জীবাশ্ম জ্বালানিকে দায়ী করে এসেছেন, এর ব্যবহার বন্ধে সর্বজনগ্রাহ্য কোনো রূপরেখা হাজির করতে পারেননি রাজনৈতিক নেতারা। প্রতিবারের মতো এবারও তাদের ওপর চাপ প্রয়োগে হাজারো জলবায়ুকর্মী প্রতিবাদের জন্য জড়ো হয়েছেন গস্নাসগোতে। তাদের অভিযোগ, ধনী দেশগুলো মোটেও তাদের প্রতিশ্রম্নতি রক্ষা করছে না। আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ বলেছেন, তথাকথিত নেতারা এমন সব কথা বলছেন, যা ভালো শোনায়, কিন্তু তাদের কাজের বেলায় এর কোনো প্রতিফলন নেই। এবার আর প্রতিশ্রম্নতির ফুলঝুরি নয়, বরং বাস্তবায়ন দেখতে চান তারা।
এই বিষয়ে আশাবাদী আয়োজক দেশ যুক্তরাজ্যের সরকার। কয়লা, গাড়ি, অর্থ, বৃক্ষ- এই চারটি বিষয়কে তারা এবারের সম্মেলনের সামনে রাখতে চাইছে। জি-২০ সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বিশ্ব রক্ষায় রাষ্ট্রনেতাদের প্রতি বারবার আর্জি জানিয়েছেন। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কার্বন নির্গমণকারী দেশ চীনের প্রেসিডেন্ট এই শি জিনপিং সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না। থাকছেন না আরেক জি-২০ সদস্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভস্নাদিমির পুতিনও। এমন বাস্তবতায় এই সম্মেলন অভিন্ন ও সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত আসবে কিনা, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করছে, চীন বাতাসে ছড়াচ্ছে তার দ্বিগুণ গ্যাস। তবে ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি গ্যাস নিঃসরণ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের টার্গেট পূরণে কপ-২৬-এ জলবায়ু নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা পেশ করবে বেইজিং। স্কটল্যান্ডের গস্নাসগো জলবায়ু সম্মেলনে নতুন করে কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ।
ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ:
প্যারিস চুক্তির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিল আদায় সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রধান লক্ষ্য থাকবে। এ বিষয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা ৪৮টি দেশের জোট ‘ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম’র (সিভিএফ) চেয়ারপারসন হিসেবে গ্লাসগো সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ২০১৫ সালে প্যারিস সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো অঙ্গীকার করেছিল, জলবায়ু তহবিলে ২০২০ থেকে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে। তিনি বলেন, 'আমরা চাই, এবার সেটির বাস্তবায়ন হবে, তোমরা শুধু মুখে মুখে বলো, এবার তোমাদের অবশ্যই দিতে হবে।' পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাত্রা এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনতে 'ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কনট্রিবিউশনস' (এনডিসি) ঠিক করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়াতে সহযোগিতার বিষয়টিও সম্মেলনে তুলে ধরবে বাংলাদেশ।
