ছবির ক্যাপশন:
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে মাঠে নেই বিএনপি। অধিকাংশ ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ। সাধারণ সদস্য (মেম্বার) পদে দলীয় প্রতীক না থাকলেও এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখার লড়াইয়ে রক্ত ঝরাচ্ছেন নিজ দলের। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ভোট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে এক মাসে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ক্ষমতাসীন দলের আট নেতা-কর্মী-সমর্থক নিহত হয়েছেন। আর জানুয়ারি থেকে প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, মেয়াদোত্তীর্ণ উপজেলার ভোটে এ পর্যন্ত ১৭৭টি সংঘর্ষে আওয়ামী লীগের ৩৮ নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। বিএনপিবিহীন ভোটে আওয়ামী লীগ যেন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ। এ নিয়ে কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এমনকি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটে চলেছে। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ‘অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী সহিংসতা’র শঙ্কা ততই বাড়ছে। দ্বিতীয় ধাপের ৮৪৬টি ইউনিয়নে ১১ নভেম্বর এবং তৃতীয় ধাপের ১ হাজার ৭টি ইউনিয়নে ২৮ নভেম্বর নির্বাচন। ইতিমধ্যে এ দুটি নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। তবে স্থানীয় এমপি ও জেলা নেতাদের ইচ্ছায় শরীয়তপুর ও মাদারীপুরে দুটি জেলায় দলীয় প্রার্থী দেওয়া হয়নি। সেখানে উন্মুক্ত ভোট হবে। প্রথম ধাপে ২১ জুন ২০৪টি ইউপি ও ২০ সেপ্টেম্বর ১৬০টি ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ইউপি নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বিরোধ মেটাতে কেন্দ্র থেকে বারবার লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা অব্যাহত আছে। দলটির সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য বারবার নির্দেশ দিচ্ছেন। চেষ্টার কমতি নেই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদেরও। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হচ্ছে না। মাঝেমধ্যে বহিষ্কারও করা হচ্ছে। তবে তা ক্ষণস্থায়ী। কঠোর হুঁশিয়ারির পরও থামেনি কোন্দল। কোন্দলের কারণে খুনোখুনি বাড়ছে- এটা মানতে নারাজ দলটির নীতিনির্ধারক ফোরামের একাধিক নেতা। আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘সব ঘটনা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ নয়। স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের আধিপত্য ধরে রাখার প্রবণতা, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের কারণেও এসব ঘটছে। তবে দলে বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে কঠোর। যারাই বিশৃঙ্খলা করবে তাদের কাউকে বরদাশত করা হবে না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে দলকে ভবিষ্যতে বেকায়দায় ফেলতে প্রতিপক্ষ কোনো দলের প্রয়োজন হবে না। ইদানীং ভাগাভাগির দৌড়ে ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্টরা এতটাই বেপরোয়া যে ‘ধরো, মারো, কাটো, তবু নিজের স্বার্থ হাসিল কর’। ‘দল গোল্লায় যাক। আগে নিজের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামাতে হবে’। যে কারণে চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, মেম্বার হতে হবে অথবা এলাকায় আধিপত্য লাগবে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। আওয়ামী লীগসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়াচ্ছেন। মাঝেমধ্যে লাশ পড়ছে। দল ক্ষমতায় থাকতেও রক্ত ঝরছে নিজ দলের কর্মীর হাতে। সন্তান হারাচ্ছেন কেউ কেউ। নির্বাচনী সহিংসতায় বৃহস্পতিবার আধিপত্য বিস্তার ও ইউপি নির্বাচন কেন্দ্র করে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার কাচারিকান্দি গ্রামে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজন নিহত ও কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন কাচারিকান্দি গ্রামের মারফত আলীর ছেলে সাদির মিয়া ও একই গ্রামের আসাদ মিয়ার ছেলে হিরণ।
গুলিবিদ্ধ হয়ে আহতরা হলেন- রমজান, মোকলেস, আহিদ মিয়া, জজ মিয়া, শামসুন্নাহার, দানা মিয়া, আলামিন মিয়া। টেঁটাবিদ্ধ হয়ে আহতরা হলেন- নাজির, নাজমা, দানিস মিয়া, মো. হক মিয়া। এরা সবাই কাচারিকান্দি গ্রামের ছোট শাহ আলমের সমর্থক। এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কাচারিকান্দি গ্রামে শাহ আলম মেম্বার ও ছোট শাহ আলমের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। দ্বন্দ্বের জেরে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। প্রতিপক্ষের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ছোট শাহ আলম গ্রুপের সাদির (২২) ও হিরণ (৩৫) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ১৫ অক্টোবর মাগুরা সদর উপজেলার জগদল ইউনিয়নের দক্ষিণ জগদল গ্রামে নির্বাচনী সহিংসতায় চারজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- ওই গ্রামের সাহাবাজ মোল্যার ছেলে সবুর মোল্যা, কবির হোসেন, চাচাতো ভাই রহমান মোল্যা ও ইমরান। এ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি মেম্বার নজরুল হোসেন। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে তফসিল ঘোষণার পর এ ওয়ার্ড থেকে সৈয়দ আলি নামে অন্য একজন মেম্বার প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। এ ঘটনার পর থেকেই কয়েকদিন ধরে এলাকায় নজরুল মেম্বার ও সৈয়দ আলি সমর্থিতদের মধ্যে বাদ বিবাদ চলছিল। তারই ধারাবাহিকতায় নজরুল মেম্বার সমর্থিতরা সৈয়দ আলি সমর্থিতদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালান। এতে অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হলে মাগুরা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনজনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইমরানের মৃত্যু হয়।
