ছবির ক্যাপশন:
বঞ্চনা, ক্ষোভ, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াচ্ছে আত্মহত্যার ঝুঁকি
রুদ্র রাসেল:
লেখাপড়া নিয়ে বকাঝকা করায় পিতার ওপর অভিমান করে জান্নাতুল তাজমি (১৬) নামের এক কিশোরীর আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। গত মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগের দিন সোমবার ওষুধ কেনার টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে নিজ ঘরের আড়ার সঙ্গে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন সাইফুল ইসলাম (৪৫) নামের এক ব্যক্তি। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত সাইফুল ইসলাম চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার সুমিরদিয়া কলোনীপাড়ার মৃত খেলাফত শেখের ছেলে।
চলতি সপ্তাহে এ দুটি ঘটনা ছাড়াও অপবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশার কারণে করোনাকালে চুয়াডাঙ্গায় আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটেছে। এদিকে, করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয় আর এক মহামারিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ। তারা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের জন্যই করোনাকালে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে আত্মহত্যার ঘটনা।
চুয়াডাঙ্গা জেলার এক সরকারি তথ্য মতে, চলতি বছরে গত ৮ মাসে এ জেলায় ২২৫ জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে। এদের মধ্যে অধিকাংশের বয়স ১৫ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। তবে এ জেলায় ৫০ বছরের বেশি বয়সের নারী-পুরুষের আত্মহত্যা ও আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনাও কম নয়। চলতি মাসের ১৩ তারিখ ওষুধ কেনার টাকা না পেয়ে দামুড়হুদা উপজেলা দর্শনা থানাধীন হিজলগাড়ি গ্রামে পিঁপড়ানাশক খেয়ে রঞ্জিলা বেগম (৫৫) নামের এক শারীরিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা আত্মহত্যা অপচেষ্টার করে। ওইদিন বেলা ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। এ জেলার চারটি উপজেলার মধ্যে আত্মহত্যার দিক থেকে সদর উপজেলা প্রথম ও দামুড়হুদা উপজেলা দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশে প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘কাজের মাঝে জাগাই আশা’। এ দিবসকে কেন্দ্র করে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন সংগঠন সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সবাইকে সক্রিয়ভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন মনোবিশেষজ্ঞরা।
মানুষের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতার বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্তকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ আকরাম বলেন, ‘আত্মহত্যা প্রবণতার অন্যতম কারণ বিষণ্নতা, ইনসমনিয়া ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক অসুস্থতা। বঞ্চনা, ক্ষোভ, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়। বর্তমানে সাইবার বুলিংয়ের কারণে আত্মহত্যা সংশ্লিষ্ট আচরণ ক্রমেই বাড়ছে। আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু স্টিগমা আছে। যেমন: আত্মহত্যা প্রবণতাকে ব্যক্তির গুরুতর সমস্যা হিসেবে আমরা মেনে নিই না। ফলে এই সমস্যা থেকে বাঁচতে ব্যক্তি নিজে অন্যের সাহায্য চাইতে আগ্রহ দেখায় না। আবার অন্যরাও আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে সাহায্য করার বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখেন না।’
চুয়াডাঙ্গা ওয়েব ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক জহির রায়হান বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গায় প্রতি বছর নারী-পুরুষের আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। অধিকাংশ নারী-পুরুষ কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এ জেলায় আত্মহত্যার পরিসংখ্যান বাড়লেও আত্মহত্যার প্রবণতা ঠেকাতে জেলায় আজ পর্যন্ত কোনো গবেষণা কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।’
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জিহাদ ফকরুল আলম খান বলেন, ‘সম্প্রতি কয়েক মাস ধরে দেখা যাচ্ছে এ জেলার মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন কারণে কিশোর থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। যুবক-যুবতীদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রেমে ব্যর্থতা, মাদক, দরিদ্রতা, বেকারত্ব, পারিবারিক নির্যাতন, শারীরিক, মানসিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেচ্ছে। ইতোমধ্যে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার মহোদয় জাহিদুল ইসলামের নির্দেশে আমরা বিভিন্ন সময় মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছি। আত্মহত্যা প্রবণতা রোধে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি সবাইকে যত্নশীল হতে হবে। নিজেদের সমস্যাগুলো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করলে আত্মহত্যার প্রবণতা থেকেও মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এছাড়াও পিতা-মাতাকে তাঁদের সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। মাদক অনেক বেশি ক্ষতি করছে তরুণদের। সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। কর্মহারা মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রত্যেকে সচেতন হলে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কমানো সম্ভব।’
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার জানান, এ জেলার মানুষ অনেক বেশি আবেকপ্রবণ। যে কারণে একটু আবেগপ্রবণ হলেই তারা আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেন। জেলায় দরিদ্র পরিবার, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে বলেও তিনি জানান
