ছবির ক্যাপশন:
ঝিনাইদহ অফিস:
আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি নেই, আবার নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এমন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছি ঝিনাইদহে। যেভাবে পারছে মানুষ, টাকা লুটে নিচ্ছে। এর মধ্যে এলএমএল কোম্পানি, ই-কমার্স, অনলাইন বিজনেস ও বিট কোয়েন ব্যবসায় অনেকে ফতুর হলেও কারো কারো গরিবের টাকায় গড়ে উঠেছে সম্পদের পাহাড়। সরকারি চাকরিজীবী, ঠিকাদার, বেসরকারি স্কুল-কলেজের সভাপতি, জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতি ও রাজনীতি পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবৈধ সম্পদ হু হু করে বৃদ্ধি পেলেও দুর্নীতি বিরোধী তদন্তকারী কোনো সংস্থার মাথা ব্যথা নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন কারো কারো বিরুদ্ধে তদন্ত করে অবৈধ সম্পদের তথ্য পেলেও শাস্তি পেয়েছে এমন নজির সৃষ্টি হয়নি। অবশ্য দুর্নীতি মামলায় বিএনপির দুই সাবেক সংসদ সদস্য মো. মসিউর রহমান, আব্দুল ওহাব ও শৈলকুপার সাবেক পৌর মেয়র খলিলুর রহমানের জেল হয়েছে। তাঁরা এখন উচ্চআদালত থেকে জামিনে আছেন। তবে হাল আমলে এ অবস্থা বেশ ভয়াবহ। ছাত্র নেতারা পর্যন্ত এখন প্রাইভেটকার হাকিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে শোনা যায়।
তথ্যানুসন্ধান করে জানা গেছে, ঝিনাইদহের বেশির ভাগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য পর্যন্ত সবারই কম-বেশি সম্পদ বেড়েছে। ভবঘুরে থেকে কতিপয় ব্যক্তি জনপ্রতিনিধি হয়ে শহর বা গ্রামে করেছেন কোটি টাকার বাড়ি। মাঠে মাঠে সম্পদ। এসব জনপ্রতিনিধিদের আয়ের তেমন উৎস না থাকলেও বিভিন্ন সময় টিআর, কাবিটা, কাবিখা, এলজিএসপি ও কর্মসৃজন প্রকল্পের টাকা নয়-ছয় করে বিত্তশালী হয়েছেন বলে কথিত আছে। স্কুল-কলেজের সভাপতি হয়ে কেউ কেউ রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণির পদমর্যাদার এমপির কতিপয় পিএসরাও এখন কোটি কোটি টাকার মালিক, ব্যাংকে অঢেল টাকা ও ঢাকায় স্ত্রী-সন্তানদের রেখে আলীশান জীবন কাটাচ্ছেন। অনেক এমপির ২-৩ জন করে পিএস। তাঁরা এক একজন বিভিন্ন দপ্তর সামলাচ্ছেন।
টাকা উপার্জনে পৌর মেয়ররাও থেমে নেই। পৌরসভাগুলোতে দৃশ্যমান পত্রিকায় কোনো টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি ছাপানো হয় না। ঢাকার আন্ডারগ্রাউন্ডস পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ছেপে নিজেরা টেন্ডার বাগিয়ে নেন। করেন নিম্নমানের কাজ। নিয়োগ বাণিজ্য করতেও তাঁরা ছাড়েন না। এভাবে অনেক পৌরসভার মেয়র টাকা-পয়সা কামিয়ে শতশত বিঘা জমি ও তেল পাম্প করেছেন। তাঁদের জ্ঞাত আয় বর্হিভুত সম্পদের হিসাব দিতে হয় না। ঢাকায় উচ্চপদে চাকরি করেন এমন অনেক ঝিনাইদহের নাগরিক জেলার বিভিন্ন মাঠে একের পর এক জমি কিনে চলেছেন। ঘুষের টাকায় এসব জমি কিনতে তাঁরা উচ্চ দর হাকিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চালাচ্ছেন।
সম্প্রতি ঝিনাইদহ গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক নির্বাহী প্রকৌশলীর ১০ কোটি টাকা লোপাটের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হলে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্তে আসেন। একইভাবে কালীগঞ্জ নিমতলা সড়কের নিম্নমানের কাজ তদন্ত করেন দুদক যশোর অফিস। ঝিনাইদহ সড়ক বিভাগের এক নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুদক আয়োজিত গণশুনানিতে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঠিকাদারী কাজ ও কেনাকাটার নথি তলব করে দুদক। কালীগঞ্জের এক দলিল লেখকের জ্ঞাত আয় বর্হিভুত সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে দুদক। দুই পৌর মেয়রের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের তালিকা করেছে দুদক। তাঁদের নামে কয়টি দলিল আছে, তাও অনুসন্ধান করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে প্রাথমিক অনুসন্ধান ও তথ্য নেওয়ার বাইরে তেমন আইনি পদক্ষেপ চোখে পড়ে না দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন যশোর অফিসের ডিডি নাজমুস সায়াদাত জানান, ‘সপ্রণোদিত হয়ে আমাদের ব্যবস্থা গ্রহণের স্কোপ নেই। যদি কারো বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ ও পত্রিকার কাটিং আসে, তাহলে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ঝিনাইদহের বেশ কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালিয়ে রিপোর্ট দিয়েছি, কারো কারো বিরুদ্ধে মামলাও করেছি।’
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির ঝিনাইদহ শাখার সহসভাপতি মানবাধিকার কর্মী আমিনুর রহমান টুকু বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল গ্রহণ করেছে। এটার চর্চা হলে ভবিষ্যতে দুর্নীতি কমতে পারে। তিনি বলেন, অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতা সারা দেশেই চলছে। ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা কেউ করেন না। তিনি এটাকে শয়তানি প্রতিযোগিতা উল্লেখ করে বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রে চরিত্র গঠন ছাড়া শিক্ষা, ত্যাগ ছাড়া ধর্ম, নৈতিকতাহীন রাজনীতি ও শ্রম ছাড়াই সম্পদ অর্জনের কারণে আজ বেপরোয়াভাবে দুর্নীতি চলছে। সুশাসন ও স্বচ্ছ রাজনীতি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় বলে তিনি মনে করেন।
সনাক ঝিনাইদহের সভাপতি অধ্যক্ষ সায়েদুল আলম বলেন, ‘সামাজিক অবক্ষয়ের অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় অন্যতম। এই অধপতনের কারণে আমাদের মধ্যে সম্পদ অর্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। অস্থায়ী সম্পদ নিয়ে আজ আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। কে কত বেশি উপরে উঠতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা চলছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে যারা কাজ করেন, তাদের আরও কঠোর হতে হবে। তা না হলে দেশ সমাজ ও রাষ্ট্র অধপতনে ডুবে যাবে।’
