ছবির ক্যাপশন:
মার্কিন সেনামুক্ত হলো আফগানিস্তান; কাবুলজুড়ে তালেবানের বিজয় উদযাপন
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বিদেশী সেনাদের হাত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়েছে আফগানিস্তান। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবকিছু গুটিয়ে কাবুল ছেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ফ্লাইট কাবুল বিমানবন্দর ছাড়ার পর আফগানিস্তানকে ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম’ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে তালেবান। ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে মার্কিন সেনাদের আফগানিস্তান ছাড়ার ঘটনাকে ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী কাবুলে অবস্থিত হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেন তালেবান যোদ্ধারা। এরপরই জয় উদযাপন করতে দেখা গেছে তাদের। আকাশে গুলি ছুড়ে আফগান সদস্যরা আনন্দ প্রকাশ করেছেন। এর আগে তালেবান দেশের নিয়ন্ত্রণ নিলেও কাবুল বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। কিন্তু অবশেষে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণও এখন তালেবানের হাতে চলে এসেছে। খবর : আলজাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স, ডন, তোলো নিউজ ও বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
এই বিজয় সবার: আফগানিস্তান থেকে মার্কিন নেতৃত্বের বহুজাতিক বাহিনীর প্রত্যাহারকে দেশটির বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, এই বিজয় আফগানিস্তানের সবার। মঙ্গলবার কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। এর আগে সোমবার মধ্যরাতের আগে আফগানিস্তান থেকে সর্বশেষ মার্কিন সৈন্যকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারের পর তালেবান যোদ্ধারা বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে জাবিউল্লাহ মুজাহিদ ২০ বছর দখলদারিত্বের পর আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারকে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আফগানিস্তান এখন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তিনি বলেন, আমাদের কোনো সন্দেহ নেই আফগানিস্তান ইসলামী আমিরাত স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য এখান থেকে অর্জন করতে পারেনি।
সংবাদ সম্মেলনে মুজাহিদ প্রতিজ্ঞা করেন, আফগানরা তাদের স্বাধীনতা, মুক্তি ও ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষা করবে। আমেরিকান সৈন্যরা কাবুল বিমানবন্দর ত্যাগ করেছে আর আমাদের জাতি পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেছে।
জবিউল্লাহ মুজাহিদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পাশ্চাত্যের সাথে কূটনীতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আফগানিস্তান চেষ্টা চালিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ‘সুসম্পর্কের বার্তা’ দিয়ে তালেবানের এই মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক চাই। আমরা তাদের সবার সাথে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্কও প্রত্যাশা করি।’ এর আগে সোমবার রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ ফ্লাইটটি আফগান ভূখণ্ড ছেড়ে যায়। এরপরই কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশ করে তালেবান।
বিবিসি জানিয়েছে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তালেবান সদস্যরা কাবুল বিমানবন্দরে হেঁটে হেঁটে প্রবেশ করছেন। বিবিসি অবশ্য স্বতন্ত্রভাবে এই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। ভিডিওতে একদল মানুষকে বিমানবন্দরের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। একই সাথে সেখানে তারা ঠিক কী কী দেখছেন সেটাও ক্যামেরায় বর্ণনা করতে দেখা যায়। ভিডিওতে এ সময় ওই ব্যক্তিদের পেছনে বিমান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাদেরকে তালেবান যোদ্ধা বলে মনে করা হচ্ছে।
কাবুলজুড়ে তালেবানের উল্লাস: যুক্তরাষ্ট্রের শেষ বিমানটি উড়ে যাওয়ার পরপরই আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলজুড়ে তালেবান সমর্থকরা ব্যাপক উল্লাসে মেতে মুহূর্তটি উদযাপন করেছে। মঙ্গলবার প্রথম প্রহরে কাবুল থেকে পাওয়া দৃশ্যগুলোতে দেখা যায় তালেবান সমর্থকরা শূন্যে গুলি ছুড়ে ও গাড়ির হর্ন বাজিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছেন। সোমবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের শেষ দলটি কাবুল বিমানবন্দর ছেড়ে যায়। ওই মুহূর্তটিতে আফগানিস্তান ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’ পায় বলে মন্তব্য করেছেন তালেবান মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ। এ ধরনের ‘ঐতিহাসিক মুহূর্তের’ সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে ‘গর্বিত’ বলে মন্তব্য করেছেন আরেক তালেবান নেতা আনাস হাক্কানি।
কয়েক দিনের মধ্যেই সরকার গঠন করবে তালেবান: আফগানিস্তানে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সরকার গঠন করবে তালেবান। মার্কিন বাহিনীর আফগানিস্তান ত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি এ তথ্য জানিয়েছেন। এ দিন ইসলামাবাদে সফররত জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেইকো মাস-এর সাথে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি আফগানিস্তানে আগামী দিনে একটি ঐকমত্যের সরকার গঠিত হবে।’ শাহ মাহমুদ কুরেশি বলেন, পাকিস্তান ইতোমধ্যেই ৩০ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ যাবতীয় সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, পাকিস্তান তার সীমান্ত খোলা রেখেছে। মানুষ দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করছে এবং বাণিজ্যও চলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আফগানিস্তানকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেয়ারও আহ্বান জানান কুরেশি। তিনি বলেন, পাকিস্তান একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল আফগানিস্তান দেখতে চায়। তালেবানের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ না নেয়া এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে সেটিকে স্বাগত জানিয়েছেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেইকো মাস। তিনি আফগানিস্তানে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আফগান পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সরিয়ে নিতে সহায়তা দিয়েছে পাকিস্তান।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন: আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে দেশটি থেকে সব সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তালেবান ফের আফগানিস্তানের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় তাড়াহুড়া করে ও তাড়াহুড়া করে দেশটি থেকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য হয় ওয়াশিংটন ও এর ন্যাটো মিত্ররা। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ব্যাপক কিন্তু বিশৃঙ্খলভাবে আকাশপথে মার্কিন নাগরিক, অন্যান্য দেশগুলোর নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করার কারণে ঝুঁকিতে থাকা বহু আফগানদের সরিয়ে নেয়ার পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যেই সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করে ওয়াশিংটন ও ন্যাটো মিত্ররা।
তবে এরপরও পশ্চিমা দেশগুলোকে সহায়তা করা ও সরিয়ে নেয়ার যোগ্য প্রায় লাখো আফগান পেছনে পড়ে থাকে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর ১৮ এয়ারবোর্ন কোরের ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল ক্রিস ডনাহিউ যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সৈন্য হিসেবে আফগানিস্তানের মাটি ছাড়েন। পেন্টাগনে এক ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল ফ্রাঙ্ক ম্যাকেনজি জানান, কাবুলের স্থানীয় সময় সোমবার রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে ছেড়ে আসা শেষ সি-১৭ ফ্লাইটে ছিলেন আফগানিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রস উয়িলসন।
সব মার্কিন সেনা চলেও যাওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের দুইশর মতো একটি দল কাবুল ছাড়তে চেয়েও শেষ ফ্লাইটে উঠতে পারেননি বলে জানান আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। রয়টার্স জানিয়েছে, তাদের সংখ্যা ১০০ এর একটু উপরে হতে পারে।
এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন মঙ্গলবারের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলোর প্রত্যাহারে তার বেঁধে দেয়া চূড়ান্ত সময়সীমার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা বলেছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন জানিয়েছেন, তালেবান তাদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ না নিলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন তালেবান সরকারের সাথে কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকবে।
তুরস্কই নিচ্ছে কাবুল বিমানবন্দরের দায়িত্ব: আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি বিদায় নেবার পর দুই সপ্তাহ ধরে লোকে লোকারণ্য কাবুল বিমানবন্দরে এখন সুনশান নীরবতা। এ অবস্থায় বিমানবন্দরটি পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে তুরস্ক। আর সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে কাতারের সাথেও আলোচনা করছে তালেবান। মঙ্গলবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্থানীয় একটি টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ ইভেস লে দ্রিয়ান ফ্রান্স-২ টেলিভিশনকে বলেছেন, এসব আলোচনার লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব কাবুল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেন আফগানিস্তান ছাড়তে চাওয়া লোকজন বাণিজ্যিক ফ্লাইট ব্যবহার করে বের হতে পারেন।
তিনি বলেন, কাবুল বিমানবন্দর সুরক্ষিত করার বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হবে। বিমানবন্দরটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাতারি ও তুর্কিদের সাথে আলোচনা চলছে। এর ব্যবহার যেন নিরাপদ হয়, আমাদের অবশ্যই সেই দাবি জানাতে হবে। তুরস্ক কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, এমন খবর গত জুলাইয়েই শোনা গিয়েছিল। ইরানি সংবাদমাধ্যম পার্স টুডের খবর অনুসারে, এ বিষয়ে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান। ৩১ আগস্ট আফগানিস্তান সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগেই তুরস্ক কাবুল বিমানবন্দরের দায়িত্ব নেবে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু গত ১৫ আগস্ট তালেবান অনেকটা বিনাবাধায় আফগান রাজধানীর দখল নিলে বিষয়টি বাস্তবায়িত হওয়া নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। তবে চলতি সপ্তাহে প্রথমবারের মতো তালেবানের সাথে বৈঠক হয় তুর্কি কর্তৃপক্ষের।
আফগান কূটনৈতিক মিশন কাতারে সরিয়ে নিলো যুক্তরাষ্ট্র: আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক মিশনকে কাতারে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন এই ঘোষণা করেন। এ দিকে মঙ্গলবার আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের ওয়েবসাইটে কাবুলে তাদের কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটে জানানো হয়, কাবুল থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের পর তারা আফগানিস্তানে মার্কিন নাগরিক ও তাদের পরিবারকে কাতারের দোহা থেকে সহায়তা দিয়ে যাবেন। সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন তার ঘোষণায় বলেন, ‘আজ থেকে আমরা কাবুলে আমাদের কূটনৈতিক উপস্থিতি স্থগিত করছি এবং আমাদের কার্যক্রম কাতারের দোহায় স্থানান্তর করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমেরিকান, বিদেশী নাগরিক এবং আফগানদের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে চান তাদের সাহায্য করার জন্য আমরা আমাদের নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখব।’
নিরাপদ দেশত্যাগে ব্যবস্থাপনার আহ্বান জাতিসঙ্ঘের: আফগানিস্তান থেকে মার্কিন নেতৃত্বের বহুজাতিক বাহিনীর প্রত্যাহারের পর আফগানদের নিরাপদ দেশত্যাগের ব্যবস্থাপনার জন্য তালেবানের কাছে আহ্বান জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ। সোমবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের পর সদস্যদের ভোটে পাস হওয়া এক প্রস্তাবে এই আহ্বান জানানো হয়। তবে জাতিসঙ্ঘের আহ্বানে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের আফগান রাজধানী কাবুলে সেফ জোন প্রতিষ্ঠার জন্য ভিন্ন এক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৩ সদস্যের ভোটে এই প্রস্তাব পাস করা হয়। রাশিয়া ও চীন ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে।
পাস করা প্রস্তাবে জানানো হয়, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ তালেবানের কাছে আশা করছে আফগান ও সব বিদেশী নাগরিকদের আফগানিস্তান থেকে নিরাপদ, সুরক্ষিত ও সুশৃঙ্খল বহির্গমনের ব্যবস্থা করবে। বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসঙ্ঘে মার্কিন দূত লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদ আশা করছে তালেবান আফগান ও বিদেশী নাগরিকদের নিরাপদ বহির্গমনের ব্যবস্থা করে দিয়ে তাদের প্রতিজ্ঞা অটুট রাখবে।’ প্রস্তাবে গত ২৭ আগস্ট তালেবানের এক বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করা হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছিলেন, এই সেফ জোনের মাধ্যমে পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংগঠিত করা যাবে এবং তালেবানকেও চাপে রাখা যাবে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের এই যৌথ প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় তালেবান জানিয়েছিল, কাবুলে সেফ জোন প্রতিষ্ঠা অপ্রয়োজনীয়। তালেবান নেতা সাইয়েদ আকবর আগা বলেন, ‘যখন শান্তির সময় আপনি সেফ জোন তৈরি করেন, এর অর্থ দাঁড়ায় দেশে নিরাপত্তা নেই। অতীতে দৈনিক তিন শ থেকে চার শ লোক নিহত হচ্ছিল কিন্তু এখন সারা দেশেই কেউ নিহত হচ্ছে না।’
যুক্তরাষ্ট্রকে ড্রোন হামলায় নিহতদের দায় নিতে হবে: মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্রকে ড্রোন হামলায় নিহতদের দায় নিতে হবে। সোমবার এ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনটি মার্কিন ড্রোন হামলার নিন্দা করে এমন বক্তব্য দিয়েছে। মার্কিন ড্রোন হামলায় বেসামরিক নাগরিক ও শিশু নিহত হওয়ার বিষয়ে সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে ড্রোন হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, দু’দশক ধরে আফগানিস্তান ও অন্যান্য দেশে মার্কিন ড্রোন হামলায় কত ব্যক্তি নিহত হলো তা নিয়ে জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহিতা না করেই তারা তাদের কর্মকাণ্ড চালু রেখেছে।
বিমানবন্দরে বিশেষ বদরি ৩১৩ ইউনিট: আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত তালেবানের বিশেষ বাহিনী বদরি ৩১৩ সদস্যের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ। মার্কিন নেতৃত্বের বহুজাতিক বাহিনীর প্রত্যাহারের পর মঙ্গলবার বিমানবন্দরে বদরি ৩১৩ সদস্যদের সাথে মিলিত হয়ে এই আহ্বান জানান তিনি।
রেক্টর ও প্রফেসরদের কাজে ফেরার আহ্বান: আফগানিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর ও প্রফেসরদের কাজে ফিরতে বলেছে তালেবান কর্তৃপক্ষ। কাতারের দোহায় অবস্থান করা তালেবানের আলোচক দলের সদস্য সুহেইল শাহিন এক টুইট বার্তায় জানান, আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুরোধ করেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডিন, প্রফেসর ও অন্যান্য কর্মকর্তারা যেন ৩১ আগস্ট তারিখ থেকে তাদের কাজে ফিরে যান। টুইট বার্তায় তিনি বলেন, আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলেছে যে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রেক্টর, ডিন, প্রফেসর ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ৩১ আগস্ট তারিখ থেকে তাদের কাজে ফিরতে হবে। ওই দিন থেকেই প্রশাসনিক ও শিক্ষা বিষয়ক কার্যক্রম চালু করতে হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস শুরু করার প্রস্তুতিও শুরু করতে হবে।
আফগানিস্তান-ছাড়া শেষ মার্কিন সৈন্যের ছবি প্রকাশ: আফগানিস্তানে ২০ বছর দখলের পর পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র দেশটি থেকে বিদায় নিয়েছে। সোমবার রাতে সর্বশেষ মার্কিন সৈন্য আফগান মাটি ত্যাগ করে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের টুইটার একাউন্টে কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে মার্কিন বিমানে আরোহণ করা সর্বশেষ সৈন্যের একটি ছবি প্রকাশ করেছে। নাইট ভিশনযুক্ত ক্যামেরায় ধারণ করা এই ছবিতে দেখা যায়, মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল ক্রিস ডোনাহো যুদ্ধসজ্জায় সর্বশেষ মার্কিনি হিসেবে বিমানে আরোহণের জন্য এগিয়ে আসছেন।
চীন-রাশিয়াকে আফগান আলোচনায় চায় জার্মানি: জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দুটি দেশের দূতাবাস এখনো কাবুলে খোলা। সে দু’টি দেশ হলো চীন এবং রাশিয়া। পশ্চিমা দেশগুলির অভিযোগ, দুটি দেশই নিজেদের মতো করে তালেবানের সাথে একপ্রকার রফা সূত্রে পৌঁছেছে। সে কারণেই তারা এখনো সেখানে দূতাবাস খোলা রেখেছে। জাতিসঙ্ঘের জরুরি বৈঠকে এই দুই দেশকে সকলের সাথে আলোচনায় যোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাস। অন্যদিকে চার দিনের পাঁচ দেশ সফরে সোমবার হাইকো মাস কথা বলেছেন উজবেকিস্তানের প্রশাসনের সাথে।
মাস জানিয়েছেন, জার্মানিতে আফগান শরণার্থী পাঠানোর বিষয়ে উজবেকিস্তান সাহায্য করবে বলে জানিয়েছে। সোমবার উজবেকিস্তান এবং তাজিকিস্তান সফর করেছেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাস। মঙ্গলবার তার কাতারে যাওয়ার কথা। কাতারে দেশের প্রশাসনের সাথে কথা বললেও তালেবানের সাথে তিনি কথা বলবেন না। কাতারে তালেবানের রাজনৈতিক দফতর আছে। এতদিন সেখান থেকেই তারা আলোচনা চালিয়েছে। মাস জানিয়েছেন, তালেবানের সাথে কথা বলবেন জার্মান প্রতিনিধি মার্কুস পোটসেল। কাতারে মার্কুসের সাথে বৈঠক করবেন মাস।
অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ একত্রে বৈঠক করে আফগানিস্তান নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। জাতিসঙ্ঘে ইতোমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। কিন্তু সেখানে চীন এবং রাশিয়ার অবস্থান স্পষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। এই পরিস্থিতিতে মাস চাইছেন রাশিয়া এবং চীনও এ বিষয়ে সহযোগিতা করুক। কারণ আফগান প্রশ্নে রাশিয়া এবং চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
