ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন:
প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণার পর মাদক নিয়ন্ত্রণে যুক্ত সংস্থা ও বাহিনীগুলো ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযানে নামলেও এর সাফল্য অনেকটা শূন্যের কোটাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এ সময় এলএসডি, আইস, ব্রাউনি ও ম্যাজিক মাশরুমের মতো ভয়ংকর নানা মাদক দেশে নতুন থাবা বসিয়েছে। হাত বাড়ালে আগের মতোই ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদক মিলছে। জমে উঠেছে মাদকের হোম ডেলিভারি। মাদকবিষয়ক গবেষকদের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যেসব সদস্যের ওপর মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব, তাদের অনেকের নিষ্ঠা ও সততার অভাব রয়েছে। মাদক নির্মূলে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি। বিশেষ অভিযান শুরুর আগে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। মাদকবিরোধী যুদ্ধে দ্রুত সাফল্য দেখাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘ক্রসফায়ার’ সমাধান ধরে নিয়ে এগিয়েছে। এ ছাড়া বাহিনীগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং অসম প্রতিযোগিতার কারণে সবাইকে এক ছাতার নিচে এনে অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। ফলে মাদক নির্মূলে সংশ্লিষ্টরা নানা হুঙ্কার দিলেও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় দক্ষতা দেখাতে পারেননি। বরং মাদকের চালান আত্মসাৎ করে পাচারকারীদের ছেড়ে দেওয়া এবং মাদক পাচারের সঙ্গে পুলিশের সরাসরি সম্পৃক্ততার ঘটনা অহরহ প্রকাশ পাচ্ছে।
গত বছর কক্সবাজারের টেকনাফের একটি চেকপোস্টে সেনাবাহিনীর মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর সেখানকার প্রভাবশালী ওসি প্রদীপ কুমারের বিরুদ্ধে মাদক পাচারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার নানা তথ্য উদ্ঘাটিত হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে মাদকের গডফাদারদের সঙ্গে সখ্য রেখে একের পর এক খুচরা মাদক ব্যবসায়ী, এমনকি নিরীহ মানুষকে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে নৃশংস হত্যার।
এদিকে ২০১৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের নেতৃত্বে অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণের সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এনএসআইয়ের যে পাঁচটি আলাদা তালিকা রয়েছে, সেই তালিকার তিনটিতে যাদের নাম রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। তবে তিন তালিকায় নাম থাকার পরও স্থানীয় সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির ব্যাপারে সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় শুরুতেই অভিযানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযান শুরুর ছয় মাসের মাথায় সিদ্ধান্তে আরও পরিবর্তন আসে। ইয়াবা কারবারে যুক্ত রাজনীতিকদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়ে বাকিদের ওপর কঠোর হওয়ার নির্দেশ আসে। যা পুরো অভিযান ঘোলাটে করে তোলে।
যদিও প্রশাসনের দাবি, বিশেষ অভিযান শুরুর পর গত তিন বছরে মাদক পাচার আশানুরুপভাবে কমেছে। পাচারকারীরা অনেকে মাদক ব্যবসা ছেড়ে ভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আগের মতো মাদক সহজলভ্য না থাকায় অনেকে নেশার পথ থেকে ফিরে এসেছে। তবে সারাদেশে মাদক উদ্ধারের যে চিত্র, তা প্রমাণ করে কারবার চলছে, কারবারিরাও সক্রিয় রয়েছে। করোনাকালে সময়েও এ বাণিজ্যে সামান্য ভাটা পড়েনি। বরং কোথাও কোথাও তা বেড়েছে। চালানে নতুন নতুন মাদক যুক্ত হয়েছে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবার বড় চালান দেশে আসার সুনির্দিষ্ট তথ্যও মিলেছে। তালিকাভুক্ত গডফাদাররা অনেকে গা-ঢাকা দিয়ে তাদের সহযোগীদের দিয়ে মাদক বাণিজ্য চালাচ্ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও তাতে আশানুরূপ সফলতা না মেলার কারণ হিসেবে মাদকবিষয়ক গবেষকরা বেশি কিছু বিষয় চিহ্নিত করেছেন। তাদের ভাষ্য, সরকার মাদকাসক্তির মূল কারণকে পাশ কাটিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে বলপ্রয়োগ করে তা বন্ধ করতে চেয়েছে। দ্বিতীয়ত, মাদক সমস্যার মূল উৎস এবং সরবরাহ চেইন ধ্বংস না করে বিপণন ও বিতরণ পর্যায়ে অভিযান চালানো হয়েছে। ফলে মাঠ পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিক্রেতা বা মাদকসেবীরা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ী ও গডফাদাররা ঠিকই পার পেয়ে গেছে। উৎস এবং সরবরাহ ব্যবস্থা অক্ষত থাকায় বিশেষ অভিযানে সাময়িকভাবে মাদকসামগ্রী বিক্রিতে কিছুটা ভাটা পড়লেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। তৃতীয়ত, এ ধরনের অভিযানে অপরাধীদের সঙ্গে নিরপরাধ মানুষ মারা যাওয়ায় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় এ ধরনের অভিযান বিতর্কিত হয়েছে এবং এক পর্যায়ে জনসমর্থন হারিয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী যদি মাদকাসক্ত হয়, তাহলে সেখানে মাদকের চাহিদা থাকবে। যেভাবেই হোক, মাদকসেবীরা মাদক পেতে চাইবে আর পাচারকারীরাও মাদক সরবরাহের চেষ্টা করবে। কিন্তু উৎপাদন ও চাহিদা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বাংলাদেশ নিতে পারেনি। তাছাড়া মাদকাসক্তদের নিরাময় ও পুনর্বাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি, যেটি মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়। সমাজবিদ ও মনস্তত্ত্ববিদরা মনে করেন, শুধু বল প্রয়োগ করে নয়, মাদক নির্মূলের জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক উদ্যোগ। যা এখনো নেওয়া হয়নি।
চলতি বছরের ৯ ফেব্রম্নয়ারি কক্সবাজারে দুই দফায় অভিযানে ১৭ লাখ ৭৫ হাজার ইয়াবা ও মাদক বিক্রির নগদ ১ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার টাকাসহ পাঁচ জনকে হাতেনাতে আটক করে ডিবি পুলিশ। গত ১৪ এপ্রিল লকডাউনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয় কোটি টাকার ইয়াবা। ১৭ এপ্রিল ইয়াবা পাচারের সময় চকরিয়া থানা পুলিশ এক রোহিঙ্গা যুবকের পেট অপারেশন করে ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা মূল্যের ইয়াবা উদ্ধার করে। ২৩ এপ্রিল টেকনাফ শাহপরীরদ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ তিনজন চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করে বিজিবি। ২৮ এপ্রিল টেকনাফের উনছিপ্রাং থেকে বিজিবির সদস্যরা ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। ২ মে টেকনাফের চৌধুরীপাড়া চিতা পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে আড়াই লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসেই শুধু ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে ২ কোটি ১ লাখ ৭০ পিস।
এদিকে শুধু ইয়াবা কারবারি নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু দুর্নীতিবাজ সদস্যও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। ২২ এপ্রিল রাতে উখিয়ায় ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন এপিবিএনের তিন সদস্য। পহেলা জুন রাজধানীর বেইলি রোডে অভিযান চালিয়ে দুই হাজার ইয়াবাসহ দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করের্ যাব। ২৮ জুন চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর ভেলস্নাপাড়া ব্রিজ এলাকায়র্ যাবের চেকপোস্টে ১১ হাজার ৫৬০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এসআই মো. মাসুদ রানা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, পুলিশ,র্ যাব, বিজিবিসহ সব সংস্থা মিলে ২০২০ সালে দেশে ৩ কোটি পিস ইয়াবা বড়ি জব্দ করে। ২০১৯ সালে ৩ কোটি ৪ লাখ, ২০১৮ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখ, ২০১৭ সালে ৪ কোটি ৭৯ হাজার পিস জব্দ করা হয়। জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি) তথ্য বলছে, বাংলাদেশে যত মাদক ঢুকছে তার মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। এই হিসাবে গত বছর দেশে ৩০ কোটি ইয়াবা বিক্রি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান জিয়া রহমান বলেন, মাদক পাচার ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম। সিংহভাগ মাদক সীমান্তপথ দিয়ে আমাদের দেশে ঢুকছে। তাই মাদকের পাচার রোধ করতে হলে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি মাদক বহনকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা এবং মাদকাসক্তি নিরাময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মাদকাসক্তি নিরাময় না করে মাদকের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হলে ভয়ংকর অপরাধ আরও বাড়বে। শুধু ক্রসফায়ার করে মাদক পাচার বন্ধ করা অসম্ভব বলে মনে করেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।
ক্রসফায়ারে মাদক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় দাবি করে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, এভাবে একটা অপরাধ নির্মূল করতে গিয়ে আরেকটা অপরাধের জন্ম হচ্ছে। মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভব। এজন্য উৎসগুলো খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উম্মে আরা বেগম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করে বা 'ক্রসফায়ার' করে সাময়িকভাবে চমক দেখানো গেলেও মাদক নির্মূল করা যাবে। এজন্য সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে। মাদকের পাচারের পথগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মনিটরিংও জরুরি। অথচ তা হচ্ছে না। ফলে মাদক পাচার প্রতিবছরই বাড়ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ উম্মে আরা আরও বলেন, মাদক পাচার একটি অর্গানাইজড ক্রাইম। এ দলের সদস্যরা অর্থ উপাজর্নে যে কোনো ভয়ংকর কাজ করতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে তারা কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করছে। মাদকের চাহিদা যতদিন কমানো যাবে না, ততদিন এর সরবরাহ রোধ করা যাবে না।
