ছবির ক্যাপশন:
দীর্ঘদিন পর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আজ
রুদ্র রাসেল:
চুয়াডাঙ্গায় করোনার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ফি নিয়ে ধন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেরই অভিযোগ, সরকারি ফি’র নামে সাধারণ মানুষের নিকট থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের কোভিড নমুনা সংগ্রহ ও অ্যান্টিজেন টেস্ট ল্যাবে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। এবং সেই টাকা সরকারি রাজস্ব খাতে জমা না করে বেতনের উছিলা দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, ‘সরকারের লিখিত প্রজ্ঞাপনে হাসপাতাল থেকে নমুনা সংগ্রহ করলে ১০০ টাকা ফি, আর বাড়িতে যেয়ে নমুনা সংগ্রহ করে আনলে ৩০০ টাকা ফি নেওয়ার বিষয়ে উল্লেখ আছে। তাই করোনার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার জন্য সরকারের লিখিত ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ীই ফি নেওয়া হচ্ছে।’ তবে করোনা এ জেলায় মহামারি আকার নিলে হাসপাতালের ল্যাবে স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকজনকে নিয়োজিত করা হলে কিছুদিন নমুনা পরীক্ষার জন্য ১০০ টাকার পরিবর্তে অতিরিক্ত ২০ টাকাসহ মোট ১২০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে, যেটা স্থানীয়ভাবে নিয়োজিত কর্মীদের বেতন বাবদ বলেও চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে করোনা শনাক্তে নমুনা দেওয়া বেশ কয়েকজন সময়ের সমীকরণকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেন। তাঁরা বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার নমুনা দিতে গেলে ফি দেওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। যদি সরকারি ফি দিতে হয় আমরা দেব, কিন্তু টাকা জমা দেওয়ার রশিদ তো পাবো? আমরা কেউই টাকা জমার রশিদ পায়নি, তবে টাকা ঠিকই দিয়েছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের কোভিড নমুনা সংগ্রহ ও অ্যান্টিজেন টেস্ট ল্যাবের ইনচার্জ আমজাদুল ইসলাম চঞ্চল বলেন, ‘গত ২০২০ সালের জুন মাসের ৩১ তারিখ থেকে আমরা করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ শুরু করি। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশ ছাড়া আমাদের কোনো কাজ করার এখতিয়ার নেই। সে সময় আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল হাসপাতালের ল্যাব থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হলে ২০০ টাকা নিতে হবে। এবং কারো বাড়িতে যেয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হলে ৫০০ টাকা করে ফি নিতে হবে। নির্দেশনা মোতাবেক আমরা একইভাবে ফি নিতে থাকি। এরপর দুইমাস অতিবাহিত হলে স্বাস্থ্য বিভাগ আবার নতুন নির্দেশনা দেয়। তাতে বলা হয় নমুনা সংগ্রহে হাসপাতালের ল্যাবে প্রতি নমুনায় ১২০ টাকা করে ফি নিতে হবে। এবং বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতি নমুনায় ৫০০ টাকা করে ফি নিতে হবে। আমরা সে অনুযায়ী ফি নিতে থাকি। এরপর ২০২১ সালের ৪ জুলাই থেকে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার জন্য ফি না নিতে এক নির্দেশনা দেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বর্তমান আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও)। এরপর ৪ থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার জন্য কোনো ফি নেওয়া হয়নি। তবে ৬ জুলাই তারিখে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন একটি সরকারি চিঠি দেখিয়ে বলেন, শুধুমাত্র হতদরিদ্রদের থেকে ফি নেওয়া যাবে না, অন্যদের থেকে ফি নিতে হবে। তাই ৭ জুলাই থেকে আবার ফি নেওয়া শুরু হয়। এখন আমরা হাসপাতালের ল্যাবে সংগ্রহ করা প্রতি নমুনায় ১২০ টাকা করে ও বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতি নমুনায় ৩০০ টাকা করে ফি নিচ্ছি।’
ফি’র নামে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ল্যাবের ইনচার্জ আমজাদুল ইসলাম চঞ্চল বলেন, প্রথম থেকেই আমাদের ল্যাবে দুজন আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত ল্যাব অ্যাসিস্টেন্ট আছেন। তাদের দিয়ে ল্যাবে কাজ করানো হয়। তবে হঠাৎ করে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ওই দুজন ল্যাব অ্যাসিস্টেন্ট দিয়ে এত নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। সে সময় স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনায় স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকজন কর্মীকে ল্যাবে নিয়োজিত করা হয়। তারপর থেকেই নমুনা সংগ্রহের সময় নেওয়া অতিরিক্ত টাকা স্থানীয়ভাবে ল্যাবে নিয়োজিত কর্মীদের মধ্যে দিন-হাজিরা (বেতন) হিসেবে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে।’
ফি নিয়েছেন অথচ রশিদ দেননি এমন প্রশ্নের জবাবে আমজাদুল ইসলাম চঞ্চল বলেন, ‘জনবল কম থাকায় এসকল ফি’র জন্য কোনো রশিদও দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে প্রতিটি নমুনা সংগ্রহ ও নমুনা পরীক্ষার হিসেব রাখতে আমাদের নির্দিষ্ট খাতাপত্র আছে, তাতেই সব হিসেব রাখা হয়।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. এ এস এম ফাতেহ্ আকরাম বলেন, ‘সরকারি লিখিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নমুনা পরীক্ষার ফি নেওয়া হয়ে হচ্ছে। সেখানে প্রতিটি নমুনার টেস্ট ফি বাবদ হাসপাতালের ল্যাবে সংগ্রহ করা হলে ১০০ টাকা ও কোনো ব্যক্তির বাড়ি থেকে সংগ্রহ করলে ৩০০ টাকা নেওয়ার কথা উল্লেখ আছে। তবে আমি শুনেছি সদর হাসপাতালের কোভিড নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা ল্যাবে অ্যান্টিজেন ও পিসিআর ল্যাব টেস্টের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হতো। যেটা আমার এই হাসপাতালে আরএমও হিসেবে যোগদানের আগে। আমি যোগদান করে অতিরিক্ত ২০ টাকা নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে বললে ল্যাব থেকে আমাকে জানানো হয়, জনবল সংকটে ল্যাব পরিচালনা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তাই করোনাকালীন সময়ে ল্যাবে স্থানীয়ভাবে কিছু কর্মীকে নিয়োজিত করে নমুনা সংগ্রহসহ বিভিন্ন্ কাজ করানো হচ্ছে। আর অতিরিক্ত নেওয়া এই টাকা দিয়েই নাকি তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। তবে তারপরেও আমি অতিরিক্ত টাকা নিতে নিষেধ করে দিয়েছি। এখন থেকে সরকারের লিখিত প্রজ্ঞাপন অনুয়ায়ী ফি নেওয়া হচ্ছে।’
নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার জন্য যে ফি নেওয়া হচ্ছে, তা সরকারি রাজস্বে জমা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আরএমও আরও বলেন, ‘প্রতি মাসে এই টাকা কোডে জমা করার কথা থাকলেও এ জেলায় করোনাভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করলে, তা করা সম্ভব হয়নি। তবে ছয় মাসের টাকা জমা করা হয়েছে।’ তিনি কোডে জমা করার কথা বললেও (কোড বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন) সে বিষয়ে কিছুই ক্লিয়ার করেননি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নাম্বারে কল করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। বিধায় চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জনের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে দেওয়া সম্ভব হলো না।
উল্লেখ্য, চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী চুয়াডাঙ্গা জেলা থেকে এ পর্যন্ত করোনা পরীক্ষার জন্য মোট ২১ হাজার ৬৮২টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের কোভিড নমুনা সংগ্রহ ও অ্যান্টিজেন টেস্ট ল্যাবে থেকে কতটি এবং এই ল্যাবের কর্মীদের মাধ্যমে মানুষের বাড়ি থেকে কতটি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য এই প্রতিবেদন করাকালে পাওয়া যায়নি। সেই তথ্য পেলে এ যাবত ফি’র নামে অতিরিক্ত কত টাকা নেওয়া হয়েছে এবং প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সরকার ফি বাবদ কত টাকা রাজস্ব পেয়েছে বা পাবে সেটারও মোটামুটি একটা যোগফল পাওয়া যেত। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে হাসপাতালের ল্যাবে স্থানীয়ভাবে কতজন কর্মীকে নিয়োজিত করা হয়েছে সে তথ্যও পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন পরে আজ বুধবার বেলা ১১টার দিকে চুয়াডাঙ্গা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই সভা করোনার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা বাবদ অতিরিক্তি টাকা নেওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে আরএমও ডা. এ এস এম ফাতেহ্ আকরাম জানান, ‘এরকম কিছুই না। দীর্ঘদিন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়নি, তাই হাসপাতালের সার্বিক উন্নয়নসহ নানা বিষয় নিয়েই এই সভা অনুষ্ঠিত হবে।’
এদিকে, জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ ও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগ ও সদর হাসপাতালের এই হ-য-ব-র-ল অবস্থা আমলে নিয়ে, তা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন সেই প্রত্যাশা সচেতনমহলসহ জেলাবাসীর।
