পারকৃষ্ণপুরে মাথাভাঙ্গা নদীতে ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের অভিযোগ
অভিযোগ তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিলেন ইউএনও দিলারা রহমান
দর্শনা অফিস:
দর্শনা পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের পারকৃষ্ণপুর গ্রামের কবরস্থান সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী মাথাভাঙ্গা নদীতে ডাবল ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। বালি উত্তোলনকারীরা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা-কর্মী হওয়ায় দেদারছে বালি উত্তোলন করে নদীপাড়ে জমিয়ে রাখছে। ভয়ে কারো কিছু করার নেই বলে জানিয়েছে গ্রামবাসী। আবার একাধিক ব্যক্তি জানান, বালি উত্তোলনকারীদের নাকি জেলা প্রশাসক অনুমতি দিয়েছেন। তবে দামুড়হুদা উপজেলা প্রশাসন বলছে এবিষয়ে তারা কিছুই জানে না।
জানা যায়, বেশ কয়েকদিন ধরে দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা খানার আওতাধীন পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের পারকৃষ্ণপুর গ্রামের কবরস্থান সংলগ্ন স্থানে মাথাভাঙ্গা নদীতে ডাবল ড্রেজার মেশিন ভিড়িয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জিয়াবুল হক ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবির বিরুদ্ধে। বালি উত্তোলনকারীরা জেলা প্রশাসনের অনুমতি আছে, এ ধরনের কথা বলে প্রকাশ্যে বালি উত্তোলন করে নদী পাড়ে রেখেই দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছে বালির ব্যবসা। অভিযুক্ত বালি উত্তোলনকারী ব্যক্তিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাসহ কারোও কিছু করার নেই বলেও জানায় গ্রামবাসী। এভাবে বালি উত্তোলন করা বন্ধ না করলে যেমন হারাবে জেলার ঐতিহ্যবাহী মাথাভাঙ্গা নদীর নব্যতা, তেমনি পার্শ্ববতী আবাদী জমি নদী গর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন গ্রামের চাষিরা।
তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন গ্রাম এলাকায় আবাদী জমিসহ বিভিন্ন নদ-নদীর নব্যতা বিনষ্ট করে এক শ্রেণির বালি ব্যবসায়ীরা ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালি উত্তোলন করে পরিবেশকে ব্যাপকভাবে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল। পরে পরিবেশের ভারসাম্য, আবাদী জমি সংরক্ষণ ও নদীর নব্যতা রক্ষার্তে সরকার ২০১০ সালের মাটি ও বালু মহল আইন পাশ করলে এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নির্বাহী ম্যাজিস্টেট কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ড্রেজার মেশিন জব্দ, মেশিন আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন ধারায় ধারাবাহিক জরিমানা করার পর ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালি উত্তোলন বন্ধ হয়।
বাংলাদেশের ২০১০ সালের বালুমহাল আইনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, বিপননের উদ্দেশ্যে কোনো উন্মূক্ত স্থান, চা বাগানের ছড়া বা নদীর তলদেশ থেকে বালি উত্তোলন করা যাবে না। এছাড়া সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারাজ, বাধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেল লাইন, ও অন্যান্য সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, আবাসিক স্থান থেকে মাটি বা বালি উত্তোলন করা নিষিদ্ধ।
এদিকে পরিবেশবিদদের মতে বালি উত্তোলনের কারণে পরিবেশের উল্লেযোগ্য ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, উদ্ভিদ ও প্রাণিকূলের নেতিবাচক পরিবর্তন, পানি ও বায়ু দূষণ, প্রাকৃতিক বৈচিত্র ও নদীর নব্যতা বিনষ্ট হওয়া। এছাড়া যে স্থানে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে, তার পাশের আবাদী জমির উর্বরতা নষ্টসহ নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। দেশের যে স্থানে বালু অবাধে উত্তোলন করা হয়, সেই স্থানে পানির লেয়ার অনেক নিচে চলে যাওয়ায় নলকূপে পানি পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এছাড়া বালি উত্তোলন প্রক্রিয়া ও পরিবহন জলবায়ু পরিবর্তনে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
এবিষয়ে বালি উত্তোলনকারী পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেদ আলীর ছেলে জিয়াবুল হক ও একই গ্রামের আখের আলীর ছেলে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবির সাথে কথা বললে দুজনই জানান, তাঁদের কাছে রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের অনুমতিপত্র রয়েছে। লিখিত অনুমতিপত্র দেখতে চাইলে তাঁরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের আরও ঊর্ধ্বতন নেতাদের কথা বলে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
এবিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুদীপ্ত কুমার সিংহ জানান, ‘নদী থেকে বালি উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এ ধরনের ঘটনায় অবশ্যই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তপূর্বক অতিদ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলারা রহমান জানায়, ‘নদী থেকে বালি উত্তোলনের বিষয়টি আমারও জানা নেই। তবে এ ধরণের বিষয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
