ছবির ক্যাপশন:
আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহে তালাক বা বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়টি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে ১৫-২০ বছরের সংসার নিমিষেই ভেঙে যাচ্ছে তুচ্ছ ঘটনায়। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে ঝিনাইদহ জেলায় তালাক ও বিচ্ছেদের এমন ভয়ঙ্কর তথ্য উঠে এসেছে। তবে নিকাহ রেজিস্টারদের ভাষ্যমতে, তালাক বা বিয়ে বিচ্ছেদের এই হার অনেক বেশি। শহর বা গ্রামের অনেক তালাকে রেকর্ড সরকারি দপ্তরে যায় না। ফলে জেলায় দিনে ১৫ থেকে ২০ জনের তালাক বা বিয়ে বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে।
ঝিনাইদহ জেলা রেজিস্টারের দপ্তর থেকে ২০২০ সালের ১৪ জুন ১৪৪ নম্বর স্মারকে নিবন্ধন মহাপরিদর্শকের কাছে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের বাৎসরিক বিয়ে ও তালাকের প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ঝিনাইদহে তালাক বা বিয়ে বিচ্ছেদের আশঙ্কাজনক তথ্যটি উঠে এসেছে। তথ্য মতে, ২০১৯ সালে ঝিনাইদহের ৬ উপজেলায় মোট বিয়ে হয়েছে ৭ হাজার ৮৪২ জনের। এরমধ্যে তালাক হয়েছে ৩ হাজার ৬৪ জনের। তালাকের দিক থেকে ছেলেরাই এগিয়ে রয়েছে।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ওই বছরে উভয় পক্ষের সম্মতিতে তালাক হয়েছে ২৭৮ জনের। ছেলে এককভাবে তালাক দিয়েছে ১ হাজার ৪৫৬ জনকে। আর মেয়ে তালাক দিয়েছে ১ হাজার ৩৩০ জন পুরুষকে। হিসাব মতে, তালাকের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে কালীগঞ্জ উপজেলা। এই জেলায় ২০১৯ সালে বিয়ে হয় ৭২৪টি। আর তালাকের ঘটনা ঘটে ৪২২টি। বিয়ের অর্ধেকের বেশি তালাকের ঘটনা ঘটেছে কালীগঞ্জে।
জেলা কাজী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ওবাইদুর রহমান জানান, করোনাকালে জেলায় তালাকের ঘটনা নেহাতই কম নয়। বিয়ের ঘটনা বৃদ্ধি না পেলেও তালাকের ঘটনা অহরহ ঘটছে।
ঝিনাইদহ পৌর কাজী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর ২০২১ সালের ৬ মাসের তথ্য দিয়ে জানান, এই সময়ে পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে বিয়ে হয়েছে ৩৯১টি। আর তালাকের ঘটনা ঘটেছে ১৬৯টি। প্রতি মাসে ২৮ জনের তালাক হচ্ছে। তথ্যমতে, পৌরসভার ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৬ মাসে একশটি বিয়ে হলেও তার অর্ধেক হয়েছে তালাক। এছাড়া জেলার ৬টি পৌরসভা, মানবাধিকার সংগঠন, মহিলাবিষয়ক অফিস, মহিলা সংস্থা ও জেলা জজ আদালতের লিগ্যাল এইড অফিসে প্রতিদিন তালাকের আবেদন জমা পড়ছে। এদিকে বিবাহিত নারী-পুরুষের বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সন্তানেরা।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, তালাকের সবচেয়ে বড় কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বনিবনা না হওয়া’। স্ত্রীর করা আবেদনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক, যৌতুক, দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে না আসা, মাদকাসক্তি, ফেসবুকে আসক্তি, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত, নৈতিকতাসহ বিভিন্ন কারণ। আর স্বামীর অবাধ্য হওয়া, শাশুড়ীর সঙ্গে মনোমালিন্য, পরকীয়া, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী না চলা, বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সন্তান না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছেন স্বামীরা। তালাকের প্রবণতা সারা জেলার গড় হিসাবেও ক্রমশ বাড়ছে।
ঝিনাইদহ শহরের চাকলাপাড়ায় বসবাসকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী জানান, তাঁর ১৫ বছরের সংসার। ঘরে একটি মেয়ে। ফেসবুকে স্বামীর পরকীয়া ধরে ফেলায় স্বামী তাঁকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। পাঠিয়েছে তালাকের নোটিশ। কোনো প্রতিবাদ করতে পারেননি তিনি। তিনি এখন অসহায়। কী করবেন ভাবতে পারছেন না। তিনি বলেন, তালাকের নোটিশ দিয়েও তিনি স্বামীর কাছ থেকে নানা ধরনের হুমকি-ধামকি পাচ্ছেন।
উপশহর পাড়ার এক যুবক জানান, তাঁর স্ত্রী সরকারি কর্মকর্তা। অফিসের বসের সঙ্গে পরকীয়া। ধরে ফেলায় স্ত্রী তাঁকে তালাক দিয়ে সেই বসকেই বিয়ে করেছে। ঘরে ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে তিনি এখন অহসায়।
