ছবির ক্যাপশন:
ধরাছোঁয়ার বাইরে পাচারকারীরা : ভূমধ্যসাগরে ২৬৪ বাংলাদেশী উদ্ধার
সমীকরণ প্রতিবেদন:
কিছুদিন না যেতেই ভূমধ্যসাগরে ভাসমান অবস্থায় আবারো ২৬৭ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়েছে তিউনিসিয়ার কোস্টগার্ড। এদের মধ্যে ২৬৪ জনই বাংলাদেশী। গত বৃহস্পতিবার এসব বাংলাদেশী অবৈধপথে স্বপ্নের ইউরোপে যাওয়ার পথে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার ভূমধ্যসাগর থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম)। প্রশ্ন উঠেছে, আদালতের নির্দেশে ২০১৫ সালে যেখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়াতে শ্রমিক পাঠানোর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে সেখানে এসব বাংলাদেশী কিভাবে লিবিয়া হয়ে সাগরপথে ট্রলারে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করছেন? দীর্ঘদিন ধরে তিউনিসিয়া ও লিবিয়া হয়ে সাগরপথে মানবপাচার অব্যাহত থাকলেও বাংলাদেশে থাকা এই চক্রের সদস্য কারা? তারা কি বরাবরের মতো এবারো ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকবে?
এ প্রসঙ্গে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর আসাদুজ্জামান কবীর বলেছিলেন, মানবপাচারের শিকার অনেক বাংলাদেশী লিবিয়ায় এসে সাগরপথে পাড়ি জমানোর সময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে আছেন। ঢাকা থেকে কিভাবে মানবপাচারকারী লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করছে সেই রুট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হচ্ছে। বিষয়টি ঢাকা অবহিত রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে লিবিয়ার বাংলাদেশ কমিউনিটি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে লিবিয়ায় অবস্থানকারী মানব পাচারকারী চক্রের সাথে ঢাকার একটি যোগসূত্র রয়েছে। এসব বাংলাদেশীকে নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়া পর্যন্ত এনে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। ঢাকার বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে আরো তৎপর হওয়ার জন্য লিবিয়ার বাংলাদেশ কমিউনিটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে তিউনিসিয়ার কোস্টগার্ড জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত অভিবাসীদের মধ্যে ২৬৪ জন বাংলাদেশী এবং তিনজন মিসরীয় নাগরিক। অবৈধভাবে ভ্রমণের সময় তাদের নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপরই এসব বাংলাদেশী সাগরে ভাসতে থাকলে তাদের উদ্ধার করা হয়। সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, তিউনিসিয়ার নৌবাহিনীর সহায়তায় বাংলাদেশীদের উদ্ধার করে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বেন গুয়ের্দেন বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। বন্দরটি লিবিয়া সীমান্তের ঠিক পাশেই অবস্থিত। সেখান থেকে উদ্ধারকৃত অভিবাসীদের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও রেড ক্রিসেন্টের হাতে তুলে দেয়া হয়। আইওএম জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত অভিবাসীদের তিউনিসিয়ার জেরবা দ্বীপের একটি হোটেলে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। গণমাধ্যমে পাঠানো সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার সময় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত তিউনিসিয়ায় ১ হাজারের বেশি অভিবাসী আটক হয়েছে। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
জাতিসঙ্ঘের তথ্য মতে, অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত কমপক্ষে ৭৬০ জন অভিবাসী মারা গেছেন। গত বছর এই সংখ্যাটি ছিল এক হাজার ৪০০ জন। উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেও একইভাবে লিবিয়ার অঞ্চলের সাগরপথে পাড়ি দেয়ার সময় দুই শতাধিক অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়। তাদের লিবিয়ার ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। এসব অভিবাসীকে পরে আইওএম এর মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
এ প্রসঙ্গে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর আসাদুজ্জামান কবীর গত সপ্তাহে বলেছিলেন, যেসব বাংলাদেশী সাগরপথে পাড়ি দেয়ার সময় ধরা পড়ে লিবিয়ার ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক রয়েছে তাদের খোঁজ নিতে দূতাবাস থেকে প্রতিনিধি যাচ্ছে। এর মধ্যে আমরা একটি ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে সেখানে অবস্থান করা ৭৮ বাংলাদেশীকে অনুরোধ জানিয়ে এসেছি তারা রাজি থাকলে আইওএমর মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এতে তারা রাজি হয়েছেন বলে জানান তিনি।
গতকাল শুক্রবার বায়রার সিনিয়র একজন সাবেক নেতা বলেন, লিবিয়া হয়ে সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার সময় যেসব অভিবাসী উদ্ধার হচ্ছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকছে বাংলাদেশী নাগরিক। এটা অবশ্যই ভালো মনে হচ্ছে না। এখন আমাদের খুঁজে বের করতে হবে এসব বাংলাদেশী কিভাবে, কার মাধ্যমে লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। নতুবা এর প্রভাব পড়বে সবখানে। অবশ্যই মানবপাচার বন্ধ করতে হবে। তিনি দাবি করেন, অন্তত রিক্রুটিং এজেন্সির কোনো মালিক এর সাথে জড়িত নেই। তবে এখন যারা ভিজিট ভিসায় দুবাই পাড়ি জমাচ্ছেন. তাদের মধ্যে থেকে অনেকে অবৈধপথে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছেন কিনা সে ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্টদের মনিটরিং জোরদার করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
